‘শিক্ষার গুণগত মানের দিকে নজর দিতে হবে’

প্রকাশ: ২০১৯-১০-০৯ ২:৫০:২৬ পিএম
আবির আজম | রাইজিংবিডি.কম

শিক্ষক, গবেষক ও কলামিস্ট শরীফা উম্মে শিরিনা। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপার্সন ও সহকারী অধ্যাপক। সমসাময়িক বিষয়ে তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন।

উম্মে শিরিনা ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের মধ্য দিয়ে তার শিক্ষকতা শুরু। কয়েক মাস গবেষণা প্রতিষ্ঠানেও কাজ করেছেন। এরপর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। দক্ষতা ও সফলতার সাথে একটি বিভাগ পরিচালনা করছেন তিনি। ক্যারিয়ারের শুরুতেই তিনি অনেকটা সফল বলা যায়। তরুণদের জন্য তার সফলতার গল্প অনুপ্রেরণাদায়ক।

তার সফলতার গল্প শুনতে, বিভাগ নিয়ে তার ভবিষ্যত পরিকল্পনা ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিষয় জানতে মুখোমুখি হয়েছিল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ও  রাইজিংবিডি ডটকমে ক্যাম্পাস পাতার লেখক আবির আজম। 

রাইজিংবিডি : আপনি বর্তমানে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপার্সনের দায়িত্বে আছেন। প্রত্যেক মানুষের সফলতার পেছনে একটা গল্প থাকে। শুরুতে, আপনার শিক্ষকতা পেশায় আসার গল্পটা জানতে চাই।

উম্মে শিরিনা : শিক্ষকতা পেশার প্রতি আমার একটা ভালো লাগা ছিল। জীবনের প্রথম চাকরির ভাইভা ছিল একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেখলাম, তারা অভিজ্ঞতা চায়। তাই সময় নষ্ট না করে একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে জয়েন করি। এরপর চট্টগ্রামের পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে যোগদান করি। সেখান থেকে বর্তমানে এই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা। আমি এই পেশাকে শ্রদ্ধা করি এবং শিক্ষা দান, শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা গবেষণার বিষয়ে আমার আগ্রহ ছিল, পাশাপাশি লেখালেখি করার সুযোগ পাব, মূলত এ জন্যই শিক্ষকতায় আসা।

রাইজিংবিডি : আপনার জীবনের স্মরণীয় ঘটনা যদি বলতেন।

উম্মে শিরিনা : আসলে অনেক স্মরণীয় ঘটনা রয়েছে। তার মধ্যে আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি, তখন আমাদের শেরপুরের জেলা স্কুল সবচাইতে ভালো ছিল। যেখানে আসলে অনেকেই চান্স পায় না, আমি সেখানে ভর্তি পরীক্ষা দেই এবং চান্স পেয়ে যাই। মূলত বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার জন্য ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা ছিল।

কারণ, ছোটবেলা থেকেই ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার স্কুলের শিক্ষকরা আমাদের বাড়িতে এসে আমাকে সেখানে ভর্তি না করার জন্য বলেন এবং আমি যে স্কুলে পড়তাম সেখানে শুধুমাত্র মানবিক বিভাগ থাকার কারণে আমাকে মানবিকই পড়তে হয়। সেদিনটা খারাপ লেগেছিল। তবে গ্রামের ঐ স্কুল থেকেই জিপিএ-৫ পাওয়ার দিনটি ভুলবার নয়।

এরপর এসএসসি পাস করে ঢাকায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি হই। কিন্তু ঢাকার পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে না পেরে পারিবারিক সমস্যার কারণে ভিকারুন্নিসা কলেজ ছেড়ে চলে এসেছি, সেই দিনটির কথা কখনো ভুলবো না। আমি কেন এত দামি স্কুল ছেড়েছি, এই প্রশ্ন আমাকে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ নিয়ে পাশ করার আগে পর্যন্ত শুনতে হয়েছে।

আরেকটা দিন বিশেষভাবে মনে আছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন ‘ডি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার সময়ে একটা ঘটনা ঘটে ছিল। এটিকে ট্রাজেডিও বলা যায়, আবার স্মরণীয়ও বলা যায়। আমি প্রথমেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বি’ ইউনিটে চান্স পাই। তারপরও ‘ডি’ ইউনিটে পরীক্ষা দেই। সবাই তখন বলাবলি করতে থাকে, তুমি তো ঢাবিতে চান্স পেয়েছ, তাহলে কেন আবার পরীক্ষা দিতে আসছ?

তখন একটা মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়। সে তখন অনেক রিকোয়েস্ট করতে থাকে, আমি যদি এখানে চান্স না পাই আমাকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিয়ে দেবে। আমার আর লেখাপড়াই হবে না। পরে ওকে বিশেষ করে ইংরেজিটা দেখাই এবং সে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে যায়।

পরীক্ষার হলে সেদিন স্যাররা আমাকে ওয়ার্নিং দিয়েছিলেন। বলছিলেন, তুমি খাল কেটে কুমির আনছো, নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারছো। ওকে দেখাতে গিয়ে দেরিতে উত্তরপত্র জমা দেয়ায় প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে বের হওবার পরে হারিয়ে যাই। পরে অবশ্য আমার ভাই আমাকে খুঁজে বের করে।

২৩ অক্টোবর , ২০১৮ ছিল স্মরণীয় দিনগুলোর একটি। কারণ, ওই দিন আমি এই বিভাগের চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব পাই। এরকম আরো স্মরণীয় ঘটনা আছে।

রাইজিংবিডি : বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক আপনি। অবশ্যই বিভাগের প্রতি আপনার অবদান রয়েছে। সেই সম্পর্কে এবং বিভাগকে নিয়ে কী ভাবছেন?

উম্মে শিরিনা : বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে আমরা তিনজন শিক্ষক একই সাথে একই দিনে যোগদান করি| আমরা সবচেয়ে ভাগ্যবান যে, আমরা শ্রদ্ধেয় ডিন মুহসিন স্যারের মত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন স্যারকে পেয়েছিলাম এবং তার সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তাছাড়া, মাত্র চার মাসে শ্রদ্ধেয় মুহসিন স্যারের নির্দেশনায় বিভাগের সিলেবাস তৈরি, অন্যান্য ডকুমেন্টেশনের কাজ করি। সব শিক্ষকের আন্তরিকতায় সেটা পেরেছিলাম।

একটি ল্যাব রুম পেয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন থেকে। আমার শিক্ষার্থীদের জন্য মিডিয়া ল্যাব স্থাপন করার পরিকল্পনা করছি। এ ল্যাব হবে অত্যাধুনিক। তাছাড়া আমরা সেশন জটের বিষয়ে খুব সতর্ক। আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা সেশন জটে যাতে না পড়ে, সেদিকে নজর রাখছি | আমাদের লক্ষ্য বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তোলা। যাতে তারা বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের সব জায়গায় নিজেদের মেলে ধরতে পারেন।

রাইজিংবিডি : কোন কোন ক্ষেত্রে আপনি গবেষণা করেন বা করতে আগ্রহী। গবেষণার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে আপনার পরামর্শ কী।

উম্মে শিরিনা : আমি মূলত সামাজিক মাধ্যম, জেন্ডার, হেল্থ কমিউনিকেশন ও ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশনের মত বিষয়ে গবেষণায় আগ্রহী। পাশাপাশি আমি সমকালসহ বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় কলাম লিখি| শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বলব, তারা যেন প্রতিটি বিষয়কে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন। কারণ, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের কাজ করাও এক ধরনের গবেষণা। সেই সাথে প্রতিটি বিষয়কে কীভাবে পরিমাণগত সমৃদ্ধির চেয়ে গুণগত মানের করা যায়, সে বিষয়ে গবেষণা করতে হবে। আর আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও গবেষণার বিকল্প নেই।

রাইজিংবিডি : আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন বলে আপনি মনে করেন?

উম্মে শিরিনা : মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় শিক্ষার হার বাড়ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মান কমে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে শিক্ষার গুণগত মানের দিকে নজর দেয়া বিশেষ প্রয়োজন। কারিগরি শিক্ষার দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার। দেশের চাহিদা অনুযায়ী মানব সম্পদ গড়ে তোলা প্রয়োজন। জনসম্পদ তৈরির জন্য এসএসসি ও এইচএসসির পর মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্পেশাল শিক্ষার মাধ্যমে দেশের জন্য তৈরি করা যায়।

প্রতি বছর হাজার গ্রাজুয়েট তৈরি করার কারণে বেকারত্বের বোঝা বাড়ছে। বর্তমানে দেশে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে সমস্যা চলছে।  এসব সমস্যা নিরসন করা দরকার। শিক্ষাখাতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অদক্ষ শিক্ষক নিয়োগ শিক্ষার মান কমে যাওয়ার জন্য দায়ী। ভালো রেজাল্ট থাকলেই ভালো শিক্ষক বা ভালো মানুষ হওয়া যায় না। গুণগত মানের শিক্ষক নিয়োগসহ সকল বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে সজাগ থাকতে হবে।

রাইজিংবিডি : আপনি তো এখন শিক্ষক এবং এক সময় শিক্ষার্থী ছিলেন। সে ক্ষেত্রে, বর্তমান এবং আপনাদের সময়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্পর্ক কেমন ছিল, আর এখন কেমন?

উম্মে শিরিনা : আসলে বর্তমানে এই সম্পর্কটা কমে গিয়েছে। আগের দিনের মতো এখন আর নেই। এটা আসলে সময়ের আবর্তনে হয়েছে। আমরাও শুনতাম আগের শিক্ষার্থীরা যেমন সম্মান করতো এখন তারা করে না। আমরাও একইভাবে দেখছি। তবে একেবারে শ্রদ্ধাবোধ যে নেই তা নয়। হয়তো বা শ্রদ্ধাবোধের ধরনটা পরিবর্তন হয়েছে। তাছাড়া এখন দেখা যাচ্ছে, শিক্ষকরা একটু বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে। এর জন্য বর্তমানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যেটা মূলত ওয়েস্টার্ন দেশগুলোতে দেখা যায়।

রাইজিংবিডি : বর্তমানে শোনা যায়, শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করতে চায় না। সে ক্ষেত্রে আপনি কাদের দায়ী করবেন?

উম্মে শিরিনা : আসলে আমাদের সামাজিক কাঠামোই দায়ী। সেই সাথে টেকনোলজিরও একটা প্রভাব রয়েছে। যেমন-বর্তমানে শিক্ষার্থীরা বেশি সময় ব্যয় করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তারা এখন খুব বেশি বই পড়ছে না। তারা শুধু এখন পরীক্ষার জন্য একাডেমিক পড়ালেখাগুলো কোনোভাবে শেষ করছে। তারা যদি অধিক সময় বিভিন্ন বই পড়ত, তাহলে বিভিন্ন বিষয় জানতে পারত এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে যে সম্পর্ক সেটা বুঝতে পারত। তবে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ই এর জন্য দায়ী।

রাইজিংবিডি : শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কিছু বলুন।

উম্মে শিরিনা : তাদেরকে অবশ্যই সব বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে। তাছাড়া নিয়মিত ক্লাসে আসতে হবে। সেই সাথে নিজের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষকদের কাছ থেকে জানার জন্য প্রশ্ন করতে হবে এবং শেখার আগ্রহ থাকতে হবে।

রাইজিংবিডি : অবসর সময় আপনি কী করেন এবং শিক্ষার্থীদের কি করতে বলবেন?

উম্মে শিরিনা : অবসর সময়ে আমি বই পড়ি, সিনেমা দেখি, সেই সাথে ঘোরাঘুরি করতে পছন্দ করি। শিক্ষার্থীদেরও আমি বলবো, তারা যেন অবসর সময়ে বেশি বই পড়ে, সিনেমা, নাটক দেখে এবং ঘোরাঘুরি করে। আর এগুলো করলে তাদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং সেই সাথে নিজেকে একজন প্রকৃত মানুষ হিসাবে তৈরি করি করতে পারবে।

রাইজিংবিডি : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

উম্মে শিরিনা : আপনাকে এবং রাইজিংবিডিকেও ধন্যবাদ।


ববি/আজম/হাকিম মাহি


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

ইউপি সদস্যসহ তিনজনের কারাদণ্ড

২০১৯-১০-১৭ ৭:৩৯:০৩ পিএম