ভালো মানুষ হতে বই পড়া জরুরি

প্রকাশ: ২০১৯-১১-১৪ ৬:০৭:১৫ পিএম
আনিকা তাসনিম সুপ্তি | রাইজিংবিডি.কম

বই পড়া বা বই কেনা নিয়ে অনেক জ্ঞানগর্ভ আলোচনা আছে। অনেক সাহিত্যিক বই পড়তে উৎসাহিত করার জন্য প্রবন্ধ লিখেছেন। তারা জ্ঞান-বুদ্ধি বৃদ্ধির কথা বলেছেন, মনুষ্যত্বের বিকাশের কথাও বলেছেন। তবে বই পড়লে কী লাভ, সে প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আগে লাভ বা ক্ষতির হিসাবটা ঠিক কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে সেটা দেখতে হবে।

জগতে দুই ধরনের মানুষ আছেন। এক ধরনের মানুষ অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে আগ্রহী। তারা মনে করেন বই পড়ে অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে হলেও নতুন কিছু শেখা যায়। আর সেই অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়। আর অন্য ধরনের মানুষেরা মনে করেন, অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার কিছু নেই। নিজে অভিজ্ঞতা অর্জন করে তবেই শিখতে হবে। তাই তারা নিজে নিজে শেখাটাকেই গুরুত্ব দিয়ে বই পড়া থেকে বিরত থাকেন।

এতে করে তারা অভিজ্ঞতা অর্জনে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েন। তবে প্রাণী হিসেবে মানুষের উন্নতি ও অগ্রগতির কারণ অন্যের কাছ থেকে শেখা। ভালো বই পড়ে আমরা বড় মানুষের চিন্তা থেকে অনেক চিন্তা নিতে পারি, নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারি। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে আমাদের বুঝ/উপলব্ধি আরও একটু বাড়াতে পারি।

অনেক সময় অনেক মানুষকে বলতে শুনি, একটি বই তার জীবন বদলে দিয়েছে। এটা হয় কারণ ঐ বই পড়ার সময় তার নিউরনে নিউরনে নানা নতুন সংযোগ তৈরি হয়েছে। আরও সংযোগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এগুলো এত বেশি পরিমাণে যে সে চিন্তার নতুন দুনিয়া দেখতে পেয়েছেন। তার জীবন নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে গেছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে বই পড়া নিয়ে ভিন্ন কিছু কথা আছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘শরীর সুস্থ রাখতেও বই পড়ার অভ্যাস দারুণভাবে মানুষকে সাহায্য করে। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, বই পড়ার সাথে শরীর এবং মনোজগতের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে বই পড়লে অবশ্যই শারীরিক ও মানসিক সুফল পাওয়া যায়।

বই পড়ার সময় মন খুব শান্ত থাকে। ফলে মানসিক চাপ কমতে শুরু করে। সেই সঙ্গে হার্টের রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক প্রভৃতি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ও হ্রাস পেতে থাকে। প্রতিদিন বই পড়লে ব্রেনের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

একজন লোক যে ধরনের বই পড়ে, যে ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করে, তার মস্তিষ্কের কানেকশনগুলো সেইরকম হয়। মানুষের অভিজ্ঞতার সাথে সাথে তার মস্তিষ্ক বদলে যায়। অভিজ্ঞতা নতুন স্নায়ুকোষ বা নিউরন তৈরি বা নতুন সংযোগ তৈরির মাধ্যমে মস্তিষ্ককে পরিবর্তন করতে পারে। এমনটা হলে নানা ধরনের ব্রেন ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও কমে যায়।

যে ব্যক্তি যতবেশি বই পড়েন, তার কল্পনা শক্তি ততবেশি বৃদ্ধি পায়। কারণ, বইয়ের ভেতরে যে জগতের বর্ণনা থাকে আমরা বই পড়ার মধ্য দিয়ে সেই জগতটির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারি।

কারণ, পড়ার মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে যেতে পারি বইয়ের ভেতরে থাকা নতুন জগতের নতুন চিত্র, নতুন বর্ণনা নতুন নতুনভাবে উপলব্ধি করতে পারি। ফলে আমাদের মনোজগতের কল্পনা শক্তি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।

বই পড়ার আর একটি উপকারিতা হলো কিছু বইয়ের মাধ্যমে আমরা জটিলভাবে চিন্তা করতে শিখি। যেমন, কোন গোয়েন্দা উপন্যাস কিংবা রহস্যজনক গল্পের বই পড়লে দেখা যায় অনেক সময় গল্পটি শেষ করার আগেই রহস্যের উন্মোচন করতে পারি। এতে আমাদের মস্তিষ্ক আরও তেজী হয়, চিন্তা ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।

বই পড়া শব্দভাণ্ডার বৃদ্ধিতে অনেক বেশি সাহায্য করে। যত বেশি বই পড়া যায় তত বেশি শব্দভাণ্ডারে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শব্দ যোগ হতে থাকে। এক সময় লক্ষ করা যায়, কথাবার্তায় আমরা প্রায়ই সেসব শব্দ ব্যবহার করি। এসব শব্দ ব্যবহার করে খুব সহজেই এবং স্পষ্টভাবে নিজেকে অন্যের কাছে প্রকাশ করা যায়।

বই নিয়ে সবচেয়ে চোখ জুড়ানো কথাটি হচ্ছে ‘আত্মার ওষুধ’ যা গ্রিসের থিবসের লাইব্রেরির দরজায় খোদাই করা আছে। তারা মনে করে বই হলো আত্নার চিকিৎসার প্রধান উপকরণ।

ইরানের একটি আদালতে নাকি সর্বোচ্চ শাস্তি বই পড়া। সঠিকভাবে বই পড়া মানুষ সহজে মন্দ কাজ করতে পারেন না। একজন ভালো মানুষ হতে হলেও বই পড়তে হবে।

লেখক গুস্তাভ ফ্লবার্ট বলেছিলেন, ‘শিশুদের মতো শুধু আনন্দের জন্য বই পড়বেন না অথবা উচ্চাকাঙ্ক্ষীদের মতো নির্দেশ পাবার জন্য পড়বেন না, পড়ুন জীবনকে জানার জন্য।”

বই পড়ে মস্তিষ্ককে শান দেয়া যায়, বিভিন্ন জিনিস জানা যায় এবং সেই অনুপাতে চিন্তা করার ক্ষমতা অর্জন করা যায়। একটি ভালো বই কেবল তথ্য এবং প্রশ্নের উত্তর দেয় না। সেই সাথে নতুন নতুন প্রশ্ন করতে শেখায়, চিন্তা করতে শেখায়। একটি বই ধারণ করে একটি ঘটনা, একটি পরিস্থিতি এবং একটি পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে এবং সেখানে কাহিনীর ভেতর দিয়ে চরিত্রগুলোর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ইতিবাচক ও নেতিবাচক ফলাফলকে তুলে ধরে। সেক্ষেত্রে বই পরোক্ষভাবে মানুষের জন্য করণীয় নানা বিষয়ের পরামর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

আনন্দ নিয়ে বই পড়া শুধুই বিনোদনের বিষয় নয়। আমাদের মস্তিষ্কের বিদ্যমান ক্ষমতা রক্ষা করা এবং তা আরও বাড়ানোর সঙ্গেও বই পড়া নিবিড়ভাবে সংযুক্ত।  যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ম্যারিয়্যান উলফ বলেছেন, ‘মানুষের মস্তিষ্কের যে আদি গঠন, তাতে এমন কোনো সক্ষমতা ছিল না যে লিখিত শব্দ বা বাক্য পড়ে সে তার অর্থ বুঝবে। মানুষ যখন থেকে পড়তে ও লিখতে শিখেছে, তখন থেকে তার মস্তিষ্কে এক নতুন ধরনের পরিবর্তনের সূচনা ঘটেছে।’

ম্যারিয়্যান আরও বলেছেন, ‘মানুষ ‘রিডিং ব্রেইন’ এর অধিকারী হয়েছে। পৃথিবীর প্রাণীকুলের মধ্যে আর কারোরই এই মস্তিষ্ক নেই, যা গড়ে উঠেছে কেবল পড়তে পড়তেই। পড়ার সময় মানুষের মস্তিষ্কে যেসব জ্ঞানীয় ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া হয়, ছবি দেখা ও শব্দ শোনার ফলে তা হয় না। অর্থ্যাৎ অডিও ভিজ্যুয়াল কনটেন্টের পেছনে দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করলে মানুষের মস্তিষ্কের সেইসব কাজকর্ম বন্ধ থাকবে, যেগুলো  পড়ার সময় ঘটে। এভাবে মানুষের 'রিডিং ব্রেইন' ক্রমে সংকুচিত হতে থাকবে। এতে কয়েক প্রজন্ম পরে দেখা যাবে শিশুদের কিছু পড়ে বুঝতে কষ্ট হচ্ছে, তাদের শেখার সক্ষমতা কমে গেছে। এ ধরনের একটা রোগ এখনই আছে, নাম 'ডিসলেক্সিয়া'। ম্যারিয়্যান উলফের মতো গবেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন ভবিষ্যতে ডিজিটাল যন্ত্রের পর্দার ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ডিসলেক্সিয়ার বিস্তার ঘটবে।

তবে আশার বিষয় এই যে, পাঠ্যবইয়ের ভেতর গল্পের বই লুকিয়ে রাত জেগে পড়ে মায়ের বকুনি খাওয়া কিংবা ক্লাসে শিক্ষকের চোখের আড়ালে পছন্দের বই পড়ে কানমলা খাওয়া প্রজন্ম এখনো অতীত নয়! তাই শুধু সুনির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক কর্মসংস্থানমুখী একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের হাতে গল্প-কবিতা-উপন্যাসের বই তুলে দিয়ে শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্যগুলো সহজে আয়ত্ত করার একটি বড় ধরনের প্রয়াস চালানোই যায়!

লেখক: শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।


কুবি/হাকিম মাহি


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

পুলিশ ও সাইফের অঘোষিত ফাইনাল

২০১৯-১২-১৪ ৯:১৪:৫৫ পিএম

সামনে শুধুই অন্ধকার

২০১৯-১২-১৪ ৯:০৯:০৯ পিএম

দল জেতার পরও হতাশ মাহমুদউল্লাহ!

২০১৯-১২-১৪ ৮:৫৩:৩১ পিএম

দেশে বিপুল সম্বর্ধনা সু চির

২০১৯-১২-১৪ ৮:৩৯:২৯ পিএম