শবনম সান্নিধ্যে এক বিকেল

প্রকাশ: ২০১৯-০৮-১৬ ৮:৩৩:৩৩ এএম
হামিদ কায়সার | রাইজিংবিডি.কম

শবনম এখন যেমন

হামিদ কায়সার : বুকে হাত দিয়ে বলুন তো পাঠক! আপনার নির্মল কৈশোর থেকে যৌবনের রঙিন নাগরদোলায় আরোহণের সময় কি কোনো চিত্রনায়িকাকে আপনি সযতনে সংগোপনে মনের পিঞ্জরে বেঁধে রেখেছিলেন? 

জানাতে খুব দ্বিধা হচ্ছে তাই না! আমি কিন্তু অসংকোচেই বলতে পারি, হুঁম, আমি রেখেছিলাম। রেখেছিলাম বলাটা ভুল হলো, বলা ভালো আমার অগোচরেই কোনো কোনো চিত্রনায়িকা আমার মনোজগতে বেশ উপনিবেশ গড়েছিল। রুপালি জগতের সোনালি স্বপ্নে তারা আমাকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিল প্রবলভাবেই! কত নাম বলব! কবরী, শাবানা, ববিতা, রুনা লায়লা! রুনা লায়লা গায়িকা হলেও আমার কাছে তার আকর্ষণ কম ছিল না। এইট থেকে নাইনে ওঠার সময় আমি পত্রিকা মারফত তার ঠিকানা পেয়ে এগারো পৃষ্ঠার একটা লম্বা চিঠি লিখেছিলাম। জানি না সে চিঠি আদৌ তার কাছে পৌঁছেছিল কিনা, নাকি এখনো ডাক বিভাগের অন্ধ প্রকোষ্ঠে মাথা কুটে মরছে! বড় আর্তি ছিল তাতে- আপনার সাথে দেখা করতে চাই রুনা!

শুধু যে দেশের চিত্রনায়িকাই মন অধিকার করে রেখেছে, তা নয়- কাজল, মাধুরী দীক্ষিত, শাবানা আজমীও কম জ্বালায়নি নিভৃতে! এমনকি উপমহাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আমার চিত্রনায়িকাপ্রীতি পেয়েছিল বিশ্বময়তা। আমি এক সময় সোফিয়া লোরেনকে দেখার জন্যই কেবল ইতালি যেতে প্রস্তুত ছিলাম, সে দেশের মার্বেল পাথরের প্রাচীন প্রাসাদগুলো দেখতে নয়! ভাগ্য ভালো যে, আমি সোফিয়া লোরেনের ভক্ত হয়েছিলাম শুধু মধুমিতা সিনেমা হলে ওর ‘ইয়েস্টার ডে টুডে অ্যান্ড টুমোরো’র ট্রেইলার দেখে, সিনেমাটা যদি সে শৈশবে দেখার সুযোগ মিলতো, তা হলে মনে হয় না কারো পক্ষে সম্ভব হতো আমাকে বাংলাদেশে বেঁধে রাখার। সোফিয়ার ভক্ত তো তবু হয়েছিলাম ট্রেইলার দেখে, ব্রিজিত বার্দোর ভক্ত হয়েছি কীভাবে জানেন, সেই মধুমিতা সিনেমা হলেই ওর একটা বিশাল পোস্টার ছিল, সেটা দেখে! কী করব! ব্রিজিত বার্দোর সিনেমা কি আর আজকের মতো যখন-তখন দেখার সুযোগ ছিল? তো, আমি যখন পরে আমার যৌবরাজ্যে পুরোপুরি অধিষ্ঠিত হলাম, তখন তো সিনেমা দেখারও অঢেল সুযোগ মিলল আর অন্যান্য চিত্রনায়িকাদেরও বিস্তার ঘটতে থাকে জীবনে! সুচিত্রা সেন, অড্রে হেপবার্ন, ক্যাথারিনা জিটা জোনস, সুবর্ণা মুস্তাফা আরো কত কে কে- দিপ্তি নাভাল, স্মিতা পাতিল, টাবু! তবে প্রায় কেউই আমার শৈশবের নায়িকাদের জায়গা আমার মনোরাজ্য থেকে কেড়ে নিতে পারেনি, ঈষৎ হৃৎকম্পন তৈরি করে গেছে এটা সত্যি!

 স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, শুধু রুনা লায়লা নয়, আমার শৈশবে বিমুগ্ধ প্রতিটি নায়িকার সঙ্গেই দেখা করার স্বপ্নে বিভোর থাকতাম। কোনো কোনো সময় তো নায়ককে সরিয়ে নিজেই ওদেরকে আমার পিঠে সওয়ার করে নিয়েছি। তবে কখনোই তাদের সাক্ষাৎ লাভ ঘটেনি। এই কেবল সেদিন, কবি পিয়াস মজিদ সাক্ষী আছে, দেড় দু’বছর আগে জীবনের গোধূলী সন্ধ্যায় এসে সত্তর ছাড়ানো চিত্রনায়িকা কবরীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল এক কবিতার কুঞ্জবনে! কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!
উচিত সময়ে শৈশব-বিমুগ্ধ চিত্রনায়িকার সন্দর্শন লাভ হয়নি বলে কিন্তু ভাবার কারণ নেই, আমার নায়িকা দর্শন ভাগ্য নেহায়েত খারাপ, বরং কী বলব, বেশ রোমাঞ্চকরও! তখন আমি শৈশবের চৌকাঠ পেরিয়ে যৌবনের দ্রাক্ষাবনে কেবল প্রবেশ করেছি, স্কুল পাল্টিয়ে ভর্তি হয়েছি মৌচাক স্কাউট উচ্চ বিদ্যালয়ে, নাইনে পড়ি, একদিন ক্লাসমেটদের মধ্যে ভোমরার মতো গুঞ্জরণ উঠল- শুটিং এসেছে! শুটিং এসেছে! শাল-গজারবন অধ্যুষিত মৌচাকে তখন প্রায় প্রায়ই শুটিং হতো। একঝাঁক ক্লাসমেট পালিয়ে চলে গেল সেই শুটিং দেখার জন্য, আমি তেমন গা করলাম না। কেন করব, আমার কোনো নায়িকাই তো আসেনি। কীসব অপরিচিত নাম বলল, তাতে উৎসাহ আরো মরে গিয়েছিল। পরের দিনের ঘটনা, যারা গতকাল শুটিং দেখতে গিয়েছিল, তারা অধিকাংশই ক্লাসে অনুপস্থিত। যাওবা দু’একজন এলো স্কুলে, তারাও এসেছে নিজেদের উত্তেজনা অন্যদের মধ্যে বইয়ে দিতে! এমন জোশ একজন নায়িকা আসছে না দোস্ত, না দেখলে জীবন বরবাদ! যাই গা, ক্লাস তো অনেক করছি! এরকম কথাবার্তা শুনলে কারই বা ধৈর্য্য থাকে ক্লাসের কাষ্ঠবেঞ্চিতে বসে অঙ্ক বা পদার্থ বা রসায়ন নিয়ে মাথা ঘামানোর! দে দৌড়! গিয়ে তো আমি বিস্মিত হতবাক- রুদ্ধবাকও! ব্রিজিত বার্দো ফেল, মেরেলিন মনরোর গ্ল্যামার তার ছক্কায় বেদম মার খেয়ে গেছে! পোশাক-আশাকের বর্ণনাতে নাই বা গেলাম! আমার সঙ্গে সঙ্গে গা কাঁপিয়ে জ্বর এসে গেল! এ জ্বর থার্মোমিটারে মাপা চলে না। নাম অঞ্জু ঘোষ! সওদাগর নামের এক সিনেমার শুটিং করতে এসেছেন! অবাক বিস্ফোরিত চোখে শুধু তাকিয়েই থাকি! নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হবার জো! যতদিন শুটিং ছিল, একদিনও বোধ হয় মিস দিইনি! আর প্রথম একদিন যে ভাব মেরে শুটিং দেখতে যাইনি, তার জন্য এখনো আফশোস লাগে!

শবনম সান্নিধ্যে লেখক (সর্ব বামে)

সে বছরই না তার পরের বছর সৈয়দ হাসান ইমাম তার ‘লাল সবুজের পালা’র শুটিং করতে এসেছিলেন খোদ আমাদের গ্রামে। সেই সুবাদে দেখা মিলেছিল সুচরিতা আর সুবর্ণার। তারপর যৌবনসাগরে যে কত ঢেউ উঠেছে, কত চিত্রনায়িকাই দেখা হয়েছে, ইন্টারভিউ পর্যন্ত নিতে হয়েছে বাসায় গিয়ে বা এফডিসিতে, সে সব আজ নাই বা-বলি, আজ যা বলার মতো ধর্তব্য তা হলো, জীবনের ভাটিবেলায় এসে এমন একজন চিত্রনায়িকার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, শুধু কি দেখা! একেবারে বাসায় গিয়ে গভীর আড্ডা দেওয়ার সুযোগ- অভাবনীয় তো বটেই তবে জটিল ঘূর্ণাবর্তের ভাবনাবাহীও! সে আমার শৈশবের বিমুগ্ধ নায়িকা ছিল কী ছিল না, থাকলে কেন বা না-থাকলেও কেন- সেসব ঘিরে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষে আমার যাকে বলে একেবারে চিড়েচ্যাপ্টা হওয়ার অবস্থা। এ চিত্রনায়িকাকে ঘিরে একবার যদি সেই হারানো সুর ফিরে পাই তো, আরেকবার মনে হয়- সে দূরের, অনেক দূরের, সে-আমার দেশ ফেলে আমার শত্রু দেশে চলে গিয়েছিল।


সুশীলদা মানে সুশীল সাহা, এক গভীর চলচ্চিত্রপ্রেমী, সিনেমার ওপর বই লিখেছেন ছ’সাতটা, অন্যান্য বিষয়ের ওপর তো আছেই, কলকাতার কাছে হৃদয়পুরে বাস করলে কী হবে, তার মনটা পড়ে থাকে বাংলাদেশেই অহর্নিশ, একটু সুযোগ পেলেই চলে আসেন এখানকার জলহাওয়ায় শ্বাস নিতে। তিনি শেষবার যখন এলেন ২০১৮ সালের আগস্টে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সেমিনার অনুষ্ঠানে দেখা হওয়ামাত্র বললেন যে, একদিন নায়িকা শবনমের সঙ্গে দেখা করতে যাব বসুন্ধরা তার বাসায়। তুমি যাবে নাকি? সুশীলদা যেন আমাকে খানিকটা প্রলুব্ধই করতে চাইলেন চোখেমুখে একটা দারুণ ভাষাভঙ্গি ফুটিয়ে তুলে। 

কী আশ্চর্য! আমি নিজের ভেতর সামান্যও রোমাঞ্চকর অনুভূতি টের পেলাম না। সুশীলদা একটু যেন অবাকই হলেন। তারপর চা-পানের অবসরে ব্যাখ্যা দিতে চাইলেন শবনমকে ঘিরে তার আবেগের স্বরূপ নিয়ে। জানো, আমার যৌবনকে কীভাবে রাঙিয়েছিল এই শবনম। কল্পনাও করতে পারবে না। ষাট দশকের গোড়ার দিকের কথা। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে খুলনা শহরের পিকচার প্যালেস সিনেমা হলে মুক্তি পেয়েছিল মুস্তাফিজের বাংলা সিনেমা ‘হারানো দিন’। নায়িকা এই শবনম আর নায়ক ছিল রহমান। আমার কাছে মনে হয়েছিল আরেক উত্তম-সুচিত্রা। আমি যে কতবার ছবিটা দেখেছি। ফেরদৌসি বেগমের সেই বিখ্যাত গানটার সাথে শবনমের নাচ এখনো চোখে ভাসে। রবীন ঘোষের সংগীত ছিল। ওই যে শোনোনি- আমি রূপনগরের রাজকন্যা রূপের যাদু এনেছি!
শুনেছি মানে। রেডিওতে ও গান শুনতে শুনতেই তো বড় হয়েছি। আমিও সায় দিয়ে উঠলাম।
কী যে সুপারডুপার হিট হয়েছিল ‘হারানো দিন’, কল্পনাও করতে পারবে না। ওই ছবি দিয়েই মোস্তফা ভিলেন হিসেবে সেট হয়ে গেল, সুভাষ দত্তও সেট হয়ে গেল কৌতুক অভিনেতা হিসেবে। তারপর থেকে শবনমের কোনো ছবি রিলিজ হলে এক মুহূর্তও দেরি করতাম না। সঙ্গে সঙ্গে দেখে ফেলতাম। তাও কি একবার দেখতাম মনে করেছো? বারবার দেখেও তৃষ্ণা মিটত না। রাজধানীর বুকে, চান্দা, তালাশ, কাজল, কারওয়াঁ, সাগর, দর্শন, জোয়ারভাটা, সন্ন্যাসী রাজা- কতবার যে দেখেছি!
তারপর তো এলো একাত্তর সাল। কতকিছুই বদলে গেল রাতারাতি। তার আগেই সত্তর সালে আমি চলে গেলাম ভারত। তার আগে-পরেই শবনম চলে গেল পাকিস্তান। কিন্তু আমার স্মৃতিকোষ থেকে তো সেই খুলনা শহর সেই শবনম এতটুকুও মুছে যায়নি। আমার হৃদয়ে শবনমের ছবিটা অবিকল সেই তেমনই আছে, কয়েক যুগ আগে হারানো দিনে যেমন দেখেছিলাম। বুঝতে পেরেছো তো ব্যাপারটা?
হ্যাঁ, বুঝতে পারি সুশীলদার অনুভূতি। শবনম শুধু তার কাছে শৈশব-যৌবনের মুগ্ধতাই নয়, দেশ হারানোর মোচড়ও! আমি আরো অনুভব করতে পারি আমার কাছে যেমন শাবানা-কবরী-ববিতা, ওনার কাছে তেমনি শবনম। আমি যেমন আমার নায়িকাদের সিনেমা দেখে দেখে পার হয়েছি কৈশোর থেকে যৌবনের স্বপ্নালু ব্রিজ- পুরো সত্তর দশক, সত্তর থেকে আশি দশক! আমি আমার সেসব বৈয়াম-ভরা সময়কালের অভিজ্ঞতা থেকেই অনুধাবন করতে পারি, শবনমকে ঘিরে তার যৌবন-আকাশের রঙধনুটা ঠিক কেমন ছিল। কত রঙে ঝলমলানো! তাছাড়া শবনমকে ঘিরে কি আমার মনের ভেতরেও কোনো-রকমেরই মায়াবী পেলবতা ছিল না? ছিল না কি কোনো ঘাস-হরিণের ছায়া? 

হ্যাঁ, মনে পড়ে। খুব সহজেই মনে পড়ে যায়। দূর-শৈশবে আমার মনকেও আলোড়িত করেছিল শবনম কোনো না কোনোভাবে। আমাদের গ্রামে ইলেকট্রিসিটি একটু বিলম্বেই এসেছিল। জিয়াউর রহমান আমলের প্রথম দিকে। বোধ করি, সাতাত্তর আটাত্তর সাল হবে। তাও আবার সব বাড়িতে নয়। বিশেষ দু’এক জায়গায়, যেমন ইউনিয়ন পরিষদ কাউন্সিল অফিস বা সরকারি কোনো কার্যালয়ে। তো, আমরা টেলিভিশনে সিনেমা হওয়ার খবর পেলেই হলো; গ্রামের ছেলেরা একসঙ্গে জোট বেঁধে বাড়ি থেকে পালিয়ে ছুটে যেতাম, এক দু’মাইল দূরে কোথাও। সে-পলায়নপর্বেই মনে আছে টিভিতে দেখেছিলাম ‘হারানো দিন’। বিশুদ্ধ আনন্দ তো বটেই, শবনম রহমান দুজনকেই ভালো লেগেছিল। শবনম আলোড়িত করেছিল চেতনালোক! সেই ভালোলাগাটুকুর জোরেই কিনা বলতে পারব না, সুশীলদার সঙ্গে শবনমের বাসায় যেতে রাজী হয়ে গেলাম। শুধু কি রাজী, একটু বুঝি ভেতর-আগ্রহেও! পরে আমাদের দুজনের সঙ্গে জুটে গেল কবি পিয়াস মজিদ। ওই যে, যে-নাকি আমার কবরী দেখার সাক্ষী ছিল!  


দরজা খুলতেই যেন রবীন ঘোষ এসে দাঁড়ালেন সামনে। অবিকল সেই চেহারা সেই মুখচ্ছবি। মুখে স্মিত হাসি। উচ্চতাও বোধহয় একই। রবীন ঘোষ তো লম্বাচওড়াই ছিলেন। সামনে না দেখলে কী হবে, ভালো করেই চিনতাম। শৈশবের চিত্রালী-পূর্বাণীতে শবনমের যেমন অনেক ছবি দেখেছি, রবীন ঘোষের ছবিও কম দেখিনি। তিনি তো শুধু পাকিস্তানেরই নামজাদা সংগীত পরিচালক ছিলেন না, বহু বাংলা জনপ্রিয় গানেরও সুর স্রষ্টা। ‘রাজধানীর বুকে’, ‘পীচ ঢালা পথ’, ‘নাচের পুতুল’, ‘তালাশ’, ‘চকোরী’, ‘আয়না’সহ অসংখ্য সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেছেন। এখনো তার সুরোরোপিত গানগুলো মানুষের মুখে মুখে ফেরে- ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো/ চাঁদ বুঝি তা জানে!’ তারপর ‘পীচ ঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি/ তার সঙ্গে এই মনটারে বেঁধে নিয়েছি’, ‘ফুলের কানে ভ্রমর এসে চুপি চুপি বলে যায়’, ‘আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন’- এমন সব গান! 

স্বামীর সঙ্গে শবনম

রবীন ঘোষ আর শবনমের সিনেমায় আসাটাও প্রায় হাত ধরাধরি করেই হয়েছিল। এহতেশাম-মুস্তাফিজ ভ্রাতৃদ্বয়ের মাধ্যমে। খ্রিস্টান রবীন ঘোষের সঙ্গে হিন্দু পরিবারের মেয়ে ঝর্না বসাকের পরিচয়টা হয়েছিল পারিবারিক সূত্রে। চেনাজানা থেকে প্রেম, পরে পরিণয়, পারিবারিক মাধ্যমেই। ১৯৭১ সালে পেশাগত কারণে দুজনই থেকে যান পাকিস্তান। মায়ের দেশে স্থায়ীভাবে ফিরে আসেন ১৯৯৯ সালে। ২০১৬ সালে পৃথিবীর মায়া কাটানোর আগ পর্যন্ত রবীন ঘোষ শবনমের সঙ্গেই বাঁধা ছিলেন জীবনে। তাদের একমাত্র ছেলে- রনি ঘোষ। থাকেন লন্ডন। আমাদের ড্রয়িং রুমে বসিয়েই রনি ঘোষ ভেতরের দিকে মিলিয়ে গেলেন, বোধ হয় মাকে আমাদের কথা জানান দিতে।

বিশাল ড্রয়িং রুমটাও অতি সাধারণ। মনে হলো না যে পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়িকার ড্রয়িং রুমে বসে আছি; যিনি একজন বাঙালি হিন্দু মেয়ে হয়েও পাকিস্তানের মতো গোড়া মুসলিম দেশে ষাট থেকে আশি এই তিন-তিনটি দশক নায়িকাদের মধ্যে সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১২ বার পেয়েছেন নিগার পুরস্কার। ড্রয়িং রুমের একটি বিশাল শেলফজুড়ে নিগারসহ জীবনের অর্জিত সব পুরস্কারগুলো থরে থরে সাজানো। তা সত্ত্বেও মনে হলো যেন পুরান ঢাকার কোনো সাধারণ বাড়ির ছায়া লেগে রয়েছে ঘরময়। 

হ্যাঁ, একদিন সেই পুরান ঢাকা থেকেই শিল্পসত্তার ভ্রমণ শুরু হয়েছিল তার। মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দুবাড়ির মেয়ে ঝর্না বসাক শখ করেই ভর্তি হয়েছিলেন বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে নাচ শিখতে। অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী মেয়েটি অল্পদিনের মধ্যে যেমন নাচে দক্ষ হয়ে উঠলেন, তেমনি বয়স বাড়ার সাথে সাথে ফুটে উঠল রূপ। ফলে একদিন বুলবুল ললিতকলা একাডেমির এক নাচের অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে আসা চিত্রপরিচালক এহতেশামের নজরে পড়ে গেলেন সহজেই। সুযোগ হলো ‘এ দেশ তোমার আমার’ ছবিতে নাচে অংশ নেওয়ার। সেই শুরু, এরপর অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবে অভিনয় করে গেলেন আরো কিছু ছবিতে। তারপর ১৯৬১ সালে এহতেশাম অনুজ পরিচালক মুস্তাফিজের ‘হারানো দিন’-এ নায়িকা হিসেবে পেলেন বিশাল ব্রেক থ্রো। শবনম নামে আবির্ভূত হয়েই জয় করে নিলেন দর্শকমন। পরের বছর উর্দু চলচ্চিত্র ‘চান্দা’ তার আসনকে পাকাপোক্ত করল। এ দুটো সিনেমাই রিলিজ হয়েছিল ঢাকা থেকে। কিন্তু পরের ছবি ‘তালাশ’ মুক্তি পেল সমগ্র পাকিস্তানে একসঙ্গে। ছবিটি যেমন ওই সময়ের সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবির মর্যাদা লাভ করে, শবনমও হয়ে উঠেন পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেত্রী। তার এই জনপ্রিয়তার ধারা অব্যাহত থাকে, প্রবল হয়, ১৯৬৮ সালে তিনি করাচীতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। জনপ্র্রিয়তার ভিতও পাকাপোক্ত হয়ে যায়। সন্দেহ কি যে, এই প্রবল প্রমত্ত জনপ্রিয়তাই তাকে পাকিস্তান থেকে আর আসতে দেয়নি বাংলাদেশ নামের নতুন রাষ্ট্রে! কে ছাড়তে চায় রাজসিংহাসন, কে উপেক্ষা করতে পারে সর্বোচ্চ জনপ্রিয়তার ধারাবাহিক সত্তা?

দশ মিনিট পর আবির্ভূত হলেন চিত্রনায়িকা। বেশ উঁচু লম্বা স্বাস্থ্যবতী। বয়স সত্তর পেরিয়েছে অনেক আগেই। তবে ষাটের বেশি মনে হলো না। পরনে সালোয়ার-কামিজ। বদলে গেছে চেহারা, মুখের আদল, তবে হাসিটা ঠিক তেমনই আছে। যখন হেসে উঠেন তখন চেনা যায় যে- এই সেই শবনম হারানো দিনের। আমি আর পিয়াস মজিদ একসঙ্গে উপভোগ করতে লাগলাম এক সময়ের হৃদয়কাঁপানো হার্টথ্রব চিত্রনায়িকা আর তার আদি এবং অকৃত্রিম ভক্ত সুশীল সাহার দুর্লভ সাক্ষাৎ ও কথোপকথনের অনন্য মুহূর্ত।

বলাবাহুল্য, চিত্রনায়িকার মন জয় করে নিতে খুব বেশি সময় লাগল না সুশীলদার। তিনি হৃদয়পুরের মানুষ, হৃদয়ের ভাষা ভালোই পড়তে জানেন। ঝর্না বসাক নামের আড়ালে আসলে তিনি যে বন্দিতা বসাকও- এই খবর সবারই জানবার কথা নয়, সুশীলদা সেটা জানান দিতেই ভারি অবাক হলেন শবনম। তারপর যেন তার কথা পেল ঝরনাধারার ফোয়ারা। যেন সব কথা শুধু আমাদের কাছেই বলবার জন্য এতদিন জমিয়ে রেখেছিলেন। আজ সব বলেকয়ে বুকের ব্যথা হালকা করতে চান। আমরাও তার কথা শুনে বেশ অবাক হই। একজন বিগত দিনের গ্ল্যামারাস চিত্রনায়িকার আড়ালের মানুষটার আসল চেহারা দেখি। যেন সিনেমার চিত্রনাট্য বা একটি উপন্যাসের খসড়া রচিত হতে থাকে চোখের সামনে। 

কথা কীভাবে শুরু হয়েছিল আজ আর মনে নেই। তবে শুরুতেই যে এই দেখাসাক্ষাৎ নিয়েই বেশ ঠাট্টা মশকরা হয়েছে এটা বেশ মনে পড়ছে। সুশীল সাহা যে ষাট দশকে শবনমের কত বড় ফ্যান ছিলেন, সেটা জানিয়ে সেই সময়ই যদি দেখা পেতেন প্রিয় নায়িকার এরকম কী একটা বলে যেন আক্ষেপ করছিলেন, তখন শবনম কৃত্রিম গম্ভীর চালে বললেন, তাহলে কি আর আজকের মতো এভাবে আসার সুযোগ হতো? আমার তো একটুও অবসর থাকত না। সুশীল সাহা খুঁনসুটি করে ওঠলেন, অবসর থাকত না, নাকি অবাঞ্ছিত ভিড় এড়াতেন। শবনম হেসে ওঠে বললেন, তখন কিন্তু এভাবে সময় নিয়ে আমার কোনো ভক্তকে দেখা দিইনি। হয়তো কথা হতো শুটিংয়ের সময় বা স্টুডিওতে। তারপর সেই কথাটাই যেন উঠল অনিবার্যভাবে, কেন একাত্তরে তিনি ফিরলেন না আপন দেশে?

পর্দায় বিভিন্ন দৃশ্যে শবনম

শবনম যেন নিজের অতীত জীবনে হারিয়ে গেলেন। কীভাবে মাত্র তেরো বছর বয়সে ঢাকার সিনেমা জগতে পা ফেলেছিলেন, স্মরণ করলেন সেইসব দিনের কথা, এত অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে যে আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনি। এর মধ্যেই নাস্তা আসে, চা আসে, বাঙালিয়ানা ঢঙে। আর বলতেই থাকেন শবনম, বলতে বলতে আমরা যে বিষয়ের প্রতি কৌতূহলী ছিলাম বেশি, সে প্রসঙ্গেও করেন আলোকপাত। সে অংশটুকু আমি সুশীল সাহার স্মৃতিচারণা থেকেই তুলে ধরছি: ‘পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ডাক এলে আমি প্রথমটায় তেমনভাবে সাড়া দিইনি। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে আমাকে ভিন দেশে গিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে হলো। তখন আমার দৈনিক আয় ছিল ছ’সাতশ টাকা। অথচ দেখতে পাচ্ছি আমার অভিনীত ছবি একটার পর একটা হিট হচ্ছে। প্রযোজক প্রচুর আয় করছেন অথচ শিল্পীদের বঞ্চিত করছেন। তখন আমিই প্রথম ছবি প্রতি পঁচিশ হাজার টাকা চেয়ে বসলাম। আমার এই চাওয়াকে কেউ ভালো চোখে দেখলেন না। প্রযোজক সমিতি আমাকে নিয়ে একটা মিটিং ডাকলেন। প্রস্তাব উঠল আমাকে বয়কট করবে। সেই সভায় খান আতাউর রহমান বলেছিলেন, শবনমকে আমি পঁচিশ কেন তেমন হলে পঞ্চাশ হাজার দেব, ওকে আমার ছবি ‘রাজা সন্ন্যাসী’তে চাই-ই চাই। তার সেই ছবিতে অভিনয় করলাম। কিন্তু সবাই তো আর খান আতা নয়। এখানে থাকলে আমি হয়তো আর কাজই পাব না। তাই সেই ১৯৬৮ সালে রবীনকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ি জমালাম পশ্চিম পাকিস্তানে। অবশ্য আমার মতো অনেকেই জীবিকার কারণে তখন পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়েছিল। 

এর মধ্যেই এসে গেল একাত্তর সাল। সে এক সাংঘাতিক সময়। আমি তখন ওখানকার সিনেমা জগতের সঙ্গে আষ্ঠেপৃষ্ঠে আটকা পড়ে গেছি। হাতে অনেকগুলো ছবির কাজ। আমার দুঃসময়ে যারা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল তাদেরকে বঞ্চিত করতে চাইনি। তাইতো অন্য অনেকের মতো পালিয়ে চলে আসিনি বাংলাদেশে। চলে এলে ওদের সঙ্গে প্রবঞ্চনা করা হতো। আমি জানি, আমার এই মনোভাবকে বাংলাদেশের অনেকেই ভালোভাবে নেয়নি। যাই হোক, চুয়াত্তর সালে আমি অফিসিয়ালি আবেদন করেছিলাম বাংলাদেশে আসব। চেয়েছিলাম নো অবজেকশন। সেটা পেতে অনেক দেরি হলো। পরে জেনেছিলাম, ওরা ভেবেছিল আমি হয়তো আর ফিরব না। যা হোক অনেকভাবে ওদের বুঝিয়ে আমি নো অবজেকশন বের করে বাংলাদেশে এসেছিলাম বাবা-মাকে দেখতে। যথা সময়ে ফিরে গিয়ে আমার কথাও রেখেছিলাম।

বাংলাদেশের একজন সংখ্যালঘু হয়েও আমি পশ্চিম পাকিস্তানে সর্বোচ্চ শিরোপা পেয়ে নায়িকা হিসেবে ১৭৫টা ছবি করেছিলাম কীভাবে। এটা আমার নিজের কাছেই মাঝে মধ্যে অবিশ্বাস্য লাগে। শিল্পীর কি সেই অর্থে কোনো দেশ আছে? সম্মানের সঙ্গে কাজ করেছি ওখানে। তারপর নব্বইয়ের দশকে এসে যখন অবসর নেবার কথা ভাবলাম- তখনই বাংলাদেশে ফিরে আসার জন্য মন আকুল হয়ে উঠল। বিশেষ করে বাবা-মার টান অনুভব করলাম প্রচণ্ডভাবে। অবশেষে পশ্চিম পাকিস্তানের পাট চুকিয়ে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে এলাম। কিন্তু এতদিন পর দেশে ফিরে পুরোনো আমার সেই জন্মভূমিকে সেভাবে খুঁজে পেলাম না। সবকিছু কেমন যেন বদলে গেছে। আগের সেই কাজের পরিবেশ নেই। আস্তে আস্তে তাই অন্তরালেই চলে গেলাম। আজ আমার বাবা-মা বেঁচে নেই, রবীনও বেঁচে নেই। ছেলে আছে ঠিকই। কিন্তু সে তো লন্ডন থাকে।’

একটা দীর্ঘশ্বাস কি লুকালেন শবনম? আমরা অনুভব করি এই বাসাটায় তিনি শুধু একাই থাকবেন আর থাকবে তার সময়কে বয়ে নিতে অতীত কর্মের উজ্জ্বল স্মৃতিগুলো। এই স্মৃতি আঁকড়ে ধরেই তিনি বাকি জীবন পাড়ি দিতে চান। যে স্মৃতির মধ্যে নিবিড় হয়ে আছে তার জন্মমাটির ঘ্রাণ, বাবা-মায়ের শ্যামলছায়া, কুঁড়ি থেকে ফুল হয়ে মেলবার শিশির-আলোক!

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৬ আগস্ট ২০১৯/তারা


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

র‍্যাবের অভিযান

চট্টগ্রামে আলোচিত যুবলীগ নেতা টিনু আটক

২০১৯-০৯-২৩ ১:৩৮:৫০ এএম

নানিয়ারচরে ইউপিডিএফ কালেক্টর আটক

২০১৯-০৯-২৩ ১২:৩১:১১ এএম

ডি ককের ঝড়ে সিরিজ ড্র করল দ.আফ্রিকা

২০১৯-০৯-২২ ১০:৫৩:১৩ পিএম

ভিসির গালিগালাজ করার অডিও ভাইরাল

২০১৯-০৯-২২ ১০:৪৯:১১ পিএম

মুখে তিক্ত স্বাদ অনুভবের ৯ কারণ

২০১৯-০৯-২২ ১০:১২:২৫ পিএম