‘কেউ চাননি আমি উদ্যোক্তা হই’

প্রকাশ: ২০২০-০৫-১০ ৫:০৯:০৮ পিএম
স্টার্লিং ডি মামুন | রাইজিংবিডি.কম

‘যে রাঁধতে জানে, সে চুলও বাঁধতে জানে’। পড়ালেখা, স্বামী-সংসার, বাচ্চা সব সামলিয়ে উদ্যোক্তা হওয়া অনেক কষ্টসাধ্য।  সেই কষ্টসাধ্য বিষয়টা সহজ করে তুলেছেন, এমন এক অদম্য তরুণীর গল্প শোনাবো আজ।

স্নিগ্ধা হাসান। তরুণ উদ্যোক্তা। জন্ম রাজধানী ঢাকার মুগদা পাড়ায়। বাবা-মায়ের দুই মেয়ের মধ্যে তিনি বড়। প্রাইমারি ও হাইস্কুল পড়েছেন হায়দার আলী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে, উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেছেন সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ থেকে এবং সম্মান শ্রেণি শেষ করেছেন তেজগাঁও কলেজ থেকে।

বর্তমানে তিনি একাধারে একজন উদ্যোক্তা, ট্রেইনার, উৎপাদক, হিসেবে কাজ করছেন। সেই সাথে স্বামীর কোম্পানিতে ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন সংসার সামলানোর পাশাপাশি।

ঢাকায় বড় হওয়া, তাই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন সেই স্কুলে পড়ার সময় থেকেই। সেই চিন্তা থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বপ্নবাজ এই তরুণের প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয় ২০১৫ সালে। যেহেতু রঙ আর তুলির সাহায্যে মনের বাসনা ফুটিয়ে তোলেন পণ্যের উপর। তাই তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়েছেন ‘কারুবাসনা’। দেশীও পণ্য নিয়ে কাজ করে থাকেন।

এ নিয়ে আক্ষেপ আছে তার। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ দেশীও পণ্য পছন্দ করেন না। তাই দেশীও পণ্যের উপর আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য আমি কিছু ভিন্ন চিন্তা করি। অনেক সময় সফলও হয়েছি।

বর্তমানে ঢাকার ৫ টা শো-রুমে কারুবাসনার পণ্য বিক্রয় হয়। তাছাড়া, ঢাকার বাইরে যেমন-চিটাগিং, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ পাইকারি বিক্রয় করেন তার পণ্য। দেশের বাইরেও রপ্তানি করেন কারুবাসনার পণ্য। ইতোমধ্যে মালেশিয়া ও অস্টেলিয়াতে পণ্য বিক্রয় করেছেন।

মূলত দেশীও পণ্য নিয়ে কাজ করছেন তিনি। ব্লক, বাটিক, টাইডাই, ও হ্যান্ড পেইন্টের শাড়ি, থ্রি-পিস, বিছানার চাদর, পরদা, কুশন-কভার ইত্যাদি নিয়ে কাজ করছি। থ্রি-পিস আর শাড়ি সব চেয়ে বেশি বিক্রি হয়।

চাকরি ছেড়ে কেন উদ্যোক্তা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি কখনোই অন্যের হয়ে চাকরি করা পছন্দ করতাম না। আর আমাদের দেশের চাকরির যে অবস্থা, আর মেয়েদের ক্ষেত্রে হলে তো কথাই নেই। তাই আমি চিন্তা করেছি, চাকরি করব না, বরং চাকরি দেবো। তাও অসহায় নারীদের। যাদের জীবনে অনেক সমস্যা। তাদের নিয়ে আমি কাজ করে থাকি। বর্তমানে ১৫ জন নারী কাজ করেন আমার সঙ্গে।’

বর্তমানে ‘কারুবাসনার’ ১টি কারখানা এবং অফিসও আছে। যেহেতু দেশীও পণ্য নিয়ে কাজ করছেন এই উদ্যোক্তা। তাই তিনি চান দেশের বাইরেও এর বিস্তার ঘটুক।

স্বপ্ন পূরণের জন্য স্বপ্নবাজ স্নিগ্ধা অনেক কষ্ট করেছেন। কারণ, তাকে কেউ কোনো সাপোর্ট করেনি। মা-বাবা থেকে শুরু করে তার পরিবারের কেউ না। এইচএসসি পরীক্ষার পর এই অদম্য তরুণীর বিয়ে হয়ে যায়। তিনি মনে করেন, সেটা ছিল তার স্বপ্ন পূরণের প্রথম বাঁধা।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘স্বামীর ভাষ্য মতে যত পারো পড়াশুনা করো। তার উপর দেশীয় পণ্য নিয়ে বা রঙ নিয়ে কাজ করতে কখনই দিব না। স্বামী যখন অফিসে যায় তখন আমি রঙ নিয়ে কাজ করতাম। বাটিকের থ্রি পিস, শাড়ি তৈরি করতাম। আশেপাশের সবাই আমার কাজের প্রশংসা করতো। এক দিন পাশের ফ্লাটের এক ভাইয়া বলেন, আপনি এই কাজগুলো ফেসবুকে দেন। তাছাড়া আমাকে কিছু ড্রেস দেন। আমার বন্ধুর দোকান আছে। তাকে দেখাবো। তার কথা মতে, তাই করলাম। ফেসবুকে কাজের ছবিগুলো দিতে লাগলাম, অনেকেই ভালো ভালো কমেন্ট করতে লাগলো।’

‘ওই দিকে ভাইয়াও তার বন্ধুর দোকানে পণ্যগুলো দেখায়, তারা পছন্দ করে, এই ভাবেই শুরু হয় আমার ব্যসায়ের যাত্রা। কিন্তু ভালো একটা পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই আর একটা বাঁধা এসে যায়। তা হলো আমার প্রেগন্যান্সি, তার উপর পড়াশুনা। যখন প্রেগন্যান্ট ছিলাম, তখন আমি অ্যাকাউন্টটিং অনার্সের ৩য় বর্ষে পড়ি। দুই দিক সামলাতে গিয়ে আমার পুরো নাজেহাল অবস্থা। প্রেগন্যান্ট অবস্থা রঙের কাজ করতে খুব সমস্যা হয়ে যেত। একা একা কাপড় কেনা, রঙ কেনা। সেগুলো ক্যারি করে বাসায় আনা। খুব কষ্ট হতো। দিন দিন সমস্যা শুধু বাড়তেই থাকল ‘, বলেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘বাবু হওয়ার পর কষ্টটা আরও বেড়ে গেলো। অন্য দিক দিয়ে আমার অর্ডার আরও বেড়েই চলেছে। সারাদিন বাবুকে সময় দিতাম, রাত ১০টার পর থেকে আমি ব্যবসায়ের কাজ করতাম। কাজ করতে করতে ২টা /৩টা বেজে যেত। আবার সকাল ৭টায় ঘুম থেকে ওঠে কাজ শুরু করতাম। এভাবেই লড়াই করে কাজ করে যেতাম  প্রতিনিয়ত। তারপর বাবু বড় হতে লাগলো আর আমার কাজের পরিধিও বাড়তে লাগলো। ব্যবসায় প্রচারের জন্য কয়েকটি মেলা করলাম। সেই মেলাতে কয়েকজন বায়ারের সঙ্গে যোগাযোগ হলো।’

‘আমি আর আমার কাজ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। এখন আমার পরিবার আমাকে আর বাধা দেয় না। বরং তারাই বলে তুমি দেখিয়ে দিয়েছো। তুমিই পারবে জীবনে এগিয়ে যেতে। শুরুটা তেমন সহজ ছিল না। যেহেতু মা বাবার স্বপ্ন ছিল ব্যাংকার হওয়া। আর আমার স্বপ্ন ছিল ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়া। মা, বাবার, স্বামীর মতের বাইরে গিয়েই মূলত আমার দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ শুরু হয়।’

‘অনেক বাধার মধ্যে মূলধন, পর্যাপ্ত জায়গা, আর পারিপার্শ্বিক বাধা তো আছেই। আর আমি যেহেতু অনলাইন, অফলাইন দুইভাবেই কাজ করছি। সেক্ষেত্রে অফলাইন থেকে অনলাইনে বেশি বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ডিজাইন চুরি,আইডি হ্যাক করা, পেজ নস্ট করা ইত্যাদি। পরিবার থেকে শুরু করে আশেপাশের সবাই মন্দ কথা বলেছে। অনেকে বাধা  দিয়েছিল এই কাজ শুরু করাতে। কারো কাছে কোনো কিছুর সাহায্য চাইলে মন্দ কথা বা কটাক্ষ ছাড়া কিছুই পাইনি। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। যেভাবেই হোক আমি আমার কাজ করে গেছি’, বলেন তিনি।

তিনি স্বপ্ন দেখেন, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও বিস্তার ঘটুক তার কারুবাসনার। যারা উদ্যোক্তা হতে চান তাদের উদ্দেশ্যে একটা কথাই বলেন স্নিগ্ধা, ‘নিজ এবং নিজের কাজের প্রতি মনোবল রাখুন। তাহলেই একদিন সফল উদ্যোক্তা হতে পারবেন।’

লেখক: তরুণ উদ্যোক্তা।


ঢাকা/হাকিম মাহি


     



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

ক্রিকেটের রেকর্ড থেকে

২০২০-০৬-০৩ ৯:০৭:২১ এএম

রেল কি করোনা এক্সপ্রেস ?

২০২০-০৬-০৩ ৮:০৮:২৬ এএম

জিপিএ-৫ পেয়েও কাঁদছেন তানিয়া

২০২০-০৬-০৩ ৩:৩২:৪৪ এএম

৮২ কোচ পেলেন মাশরাফির ‘উপহার’

২০২০-০৬-০৩ ১:২২:৪১ এএম