বিস্মৃত নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী

প্রকাশ: ২০১৯-০৮-০২ ১:২২:০৪ পিএম
সাঈদ আহসান খালিদ | রাইজিংবিডি.কম

সাঈদ আহসান খালিদ : কুমিল্লার লাকসাম বেড়াতে গিয়ে আমার আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল একটি নদীর নাম- ডাকাতিয়া। ভেবেছি এই নদী আমার মন ডাকাতি করে নিয়ে যাবে। কিন্তু সেই ডাকাতিয়া নদী এমন শ্রীহীন, স্রোতহীন, মৃতপ্রায় অবস্থায় আবিষ্কার করবো- কে জানতো! যে ডাকাতিয়া নদী দেখেছি তাকে নদী বলতেই আপত্তি হওয়ার কথা- সংকীর্ণ হতে হতে সেটি এখন খাল। সেই খালে স্রোত নেই, সৌন্দর্য নেই, মায়া নেই, শ্যাওলার ভিড়ে জল চোখেই পড়ে না।
ডাকাতিয়া নদীর উত্তর তীরে স্থাপত্যকলার অপূর্ব নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাসাদ- নবাব ফয়জুন্নেছা হাউজ। এটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর এককালের বাসভবন যা ‘নবাববাড়ি’ নামে খ্যাত। কথিত আছে, বিয়ের ১৭ বছর পর নবাব ফয়জুন্নেছা জানতে পারেন তাঁর স্বামী হাছান আলী জমিদারের আরেকজন স্ত্রী রয়েছে। অসাধারণ ব্যক্তিত্ববান, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, দৃঢ়চেতা নবাব ফয়জুন্নেছা এটি মানতে পারেননি এবং পৃথক থাকার জন্য সাড়ে ৩ একর জমির উপর তাঁর বিয়ের কাবিনের ১ লাখ ১ টাকা দিয়ে এই বাড়ি নির্মাণ করেন। বাড়িটি নির্মাণ করতে প্রায় ৩ বছর সময় লাগে। ব্রিটিশ আমলের সিমেন্ট, রড, চুন ও সুরকি দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করা হয়। প্রাসাদের পাশেই ১০ গম্বুজবিশিষ্ট একটি অনিন্দ্য স্থাপত্যশৈলীর পারিবারিক মসজিদ। এটির সাথে লাগানো পারিবারিক কবরস্থান যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন নবাব ফয়জুন্নেছা এবং নবাব পরিবারের অন্যান্য বংশধর। কবর জেয়ারত করে নবাব বাড়িতে প্রবেশ করলাম। প্রবেশ করেই মন আরো দমে গেল।

এতো চমৎকার একটি স্থাপত্য যাকে মনে করা হয় দক্ষিণ এশিয়ার সৌন্দর্যমণ্ডিত বাড়িগুলোর অন্যতম, যেটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের স্মৃতিবাহী- সেটির এমন অযত্ন, অবহেলা, শ্রীহীন, রিক্ত রূপ দেখে হতাশ হলাম। গাছপালা, বাগান কিছুই অবশিষ্ট নেই, চারপাশ নোংরা হয়ে আছে কদর্যভাবে, চুন-সুরকি-ইট-পলেস্তরা খসে পড়ছে। জায়গায় জায়গায় নগ্নভাবে বেরিয়ে এসেছে জংধরা রড, দরজা-জানালা ভেঙে খুলে পড়ছে, কালি ঝুলে আছে দেয়ালের পরতে পরতে। সর্বত্র কেমন পরিত্যক্ততা, মলিনতার ছাপ। বাড়ির ভেতরে ঢুকে আরও হতভম্ব হতে হলো। নিচতলার একাংশ ভাড়া দেয়া হয়েছে, আরেকটু ভেতরে ঢুকতেই বাধা পেলাম; ভেতরের গেট তালা মারা। অনেক ডাকাডাকির পরেও গেট খুললো না।

বাইরে বেরিয়ে এলাম, দৃষ্টি মেলে তাকালাম দ্বিতল ভবনটির দিকে। বুঝাই যাচ্ছে নবাব ভবন রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে আজ ধ্বংসের পথে। নবাব ফয়জুন্নেছার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি ওয়াকফে দান করা। দেখাশোনার জন্য বংশানুসারে খাদেমের দায়িত্বে সৈয়দ মাসুদুল হক চৌধুরী এবং সৈয়দ কামরুল হক চৌধুরী থাকলেও তাঁদের কোন সচেতন চেষ্টা দৃশ্যমান হলো না। বরং অভিযোগ উঠেছে বিশাল এই ভূসম্পত্তি ও দিঘি ভরাট ও বিক্রির অপচেষ্টার। এই ঐতিহ্য রক্ষার জন্য সরকারি কোনো প্রচেষ্টাও নেই।

নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ও একমাত্র মহিলা নবাব। মহারানী ভিক্টোরিয়া নিভৃত পল্লীর এই বিদূষী নারীর বিদ্যাউৎসাহ, সমাজ সংস্কার আর জমিদার হিসেবে তাঁর জনকল্যাণে মুগ্ধ হয়ে ‘নবাব’ উপাধি প্রদান করেছিলেন। ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীনে তৎকালীন গোরা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থার চারদেয়ালের মাঝে থেকেও ফয়জুন্নেছা ছিলেন স্বাধীনচেতা, মন মানসিকায় সম্পূর্ণ কুসংস্কারমুক্ত। কোন প্রতিবন্ধকতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি, ফয়জুন্নেছা তার চিন্তা ও কর্মে ছিলেন পুরোপুরি আধুনিক । শিক্ষার প্রতি ফয়জুন্নেসার অদম্য আগ্রহ দেখে পিতা তার জন্য বাড়িতে গৃহশিক্ষক রাখার ব্যবস্থা করেন। বাংলা, আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃত- এ চারটি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভসহ ফয়জুন্নেছার সাহিত্য প্রতিভা স্ফূরণে তার সেই গৃহশিক্ষক তাজউদ্দিনের অবদান অতুলনীয়।

রানীর বাসভবন

সমাজ সংস্কারের অংশ হিসেবে ১৮৭৩ সালে (বেগম রোকেয়ার জন্মের সাত বছর পূর্বেই) নারী শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে তিনি মেয়েদের জন্য কুমিল্লায় একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন যা এখন লাকসাম পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় নামে পরিচিত। নবাব ফয়জুন্নেছা অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন। তিনি পর্দার আড়াল থেকে এই বাড়িতে বসে বিচারকার্য সম্পাদন, রাস্তাঘাট, পুল-ব্রিজ, স্কুল-মাদ্রাসাসহ যাবতীয় জনকল্যাণমূলক কাজ পরিচালনা করতেন। 'নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ', 'নবাব ফয়জুন্নেছা ও বদরুন্নেসা উচ্চবিদ্যালয়' তার সৃষ্টি। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ তৈরিতে রয়েছে তার বিশেষ অবদান। ১৮৯৩ সালে পর্দানশীন, বিশেষত দরিদ্র মহিলাদের চিকিৎসার জন্য তিনি নিজ গ্রামে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন যেটির নাম ছিল- 'ফয়জুন্নেছা জেনানা হাসপাতাল'। এছাড়া ১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অসংখ্য দাতব্য প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, এতিমখানা সড়ক নিমার্ণ করে তার মানবতাবাদী ও সমাজ সংস্কারের অনন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন। ১৮৯৪ সালে পবিত্র হজ পালন করার প্রাক্কালে তিনি মক্কায় হাজীদের জন্য একটি 'মুসাফিরখানা' এবং মদিনায় একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যক্তিজীবনে ধার্মিক হলেও এই মহিলা নবাব ছিলেন চেতনায় অসাম্প্রদায়িক। জাতভেদ তিনি অত্যন্ত ঘৃণা করতেন। তারই সাহায্য আর সহযোগিতায় লাকসামে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য মন্দির, উপাসনালয় যা আছো সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে যখন মুসলিম পুরুষের পদচারণা ছিল সীমিত সে সময়ই নবাব ফয়জুন্নেছা লিখেছেন- ‘রূপজালাল’ গ্রন্থ। যেটি প্রকাশিত হয়েছিল আরেক মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়ার জন্মেরও ৪ বছর পূর্বে ১৮৭৬ সালে। গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কোন নারী লেখকের প্রথম প্রকাশিত বই। ‘রূপজালাল' ব্যতীত ফয়জুন্নেছা কর্তৃক দু'খানি গ্রন্থের নাম পাওয়া যায়- ‘সঙ্গীত লহরী' ও ‘সঙ্গীত সার'। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না সাহিত্য সাধনায় ফয়জুন্নেসার পথ ধরে বেগম রোকেয়ার আবির্ভাব হয়েছে।

এশিয়ার এই মহীয়সী নারী, বাংলাদেশের গৌরব নবাব ফয়জুন্নেছা আজ বাংলাদেশে বিস্মৃত প্রায়, তার নবাব বাড়ির মতোই তিনিও বিলীন হয়ে যেতে বসেছেন। তার বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া একসময়ের প্রমত্তা নদী 'ডাকাতিয়া আজ স্রোতহীন, মৃতপ্রায়। সব যেন বিষণ্ণতার একই সুতোয় গাঁথা। নবাব ফয়জুন্নেছার জন্ম ও মৃত্যু দিবস দেশে পালিত হয় না। আন্তর্জাতিক নারী দিবস আসে যায় অথচ নারী শিক্ষা, নারী অধিকারের এই অগ্রপথিককে কখনো স্মরণ করা হয় না। বেগম রোকেয়ার বহু আগেই একই চিন্তা-কাজ এই মহিয়সী নারী সম্পাদন করে গেলেও নবাব ফয়জুন্নেছা পাদপ্রদীপের আলোর বাইরেই রয়ে গেলেন। মৃত্যুর ১০১ বছর পরে ২০০৪ সালে ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়।

এই মহিয়সী নারী, উপমহাদেশের প্রথম ও একমাত্র মহিলা নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী আমাদের গর্ব, তাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিকভাবে স্মরণ করা হোক। নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর স্মৃতি সংরক্ষণ করে জাদুঘর করা হলে, ডাকাতিয়া নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা হলে এই সুরম্য বাড়িটি এবং নবাবের স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলো হতে পারে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম দর্শনীয় স্থান।
 


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২ আগস্ট ২০১৯/তারা

     


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

সবজির ঝুড়িতে ইয়াবা, আটক ২

২০১৯-০৮-২০ ৯:৫৩:০৮ পিএম

প্রথম ম্যাচে হারল নারী হকি দল

২০১৯-০৮-২০ ৯:১৪:০৭ পিএম

ইতালির প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ

২০১৯-০৮-২০ ৮:৫০:০৮ পিএম