‘ধার করো, কর্জ করো, গণি মিয়ার হাট করো’

প্রকাশ: ২০১৯-০৮-১০ ১:০৩:২২ পিএম
জাহিদ সাদেক | রাইজিংবিডি.কম

গণি মিয়ার হাটে মিরকাদিমের গরু

জাহিদ সাদেক : দু’দিন পরেই কোরবানি ঈদ। গরু কেনার জন্য ঢাকাবাসী এবং এর আশপাশের মানুষের ভিড় বাড়ছে গরুর হাটে। কিন্তু আমাদের কি জানা আছে ঢাকার বিখ্যাত এবং প্রাচীন গরুর হাট কোনটি? এমন প্রশ্নের উত্তরে সবার আগে বলতে হয় গণি মিয়ার হাটের কথা। এক সময় ঢাকার গরুর হাট মানেই ছিল গণি মিয়ার হাট আর মিরকাদিমের গরু। ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ গ্রন্থের লেখক নাজির হোসেনের বর্ণনা থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে ঢাকার নবাব আবদুল গণি এখানে হাট বসিয়েছিলেন। সেজন্য হাটটি গণি মিয়ার হাট নামে পরিচিত হয়েছে। হাটটি প্রতিষ্ঠার পর জনসাধারণকে ঢোল বাজিয়ে এ খবর জানানো হয়। ঢুলিরা ঢোল বাজিয়ে বলত- ‘ধার করো, কর্জ করো গণি মিয়ার হাট করো।’

নবাব আব্দুল গণির নাম থেকেই যে গণি মিয়ার হাট নামটি এসেছে এই মত সমর্থন করেছেন বিখ্যাত ঢাকাবিদ ও ঢাকা কেন্দ্রের পরিচালক মোহাম্মদ আজিম বখশ। তিনি বলেন, নবাব আবদুল গণি ঢাকার জমিদারদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এবং উনিশ শতকের শেষ দিকে পূর্ববঙ্গের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তার বাসভবনে দরবার ছিল, যেখান থেকে তিনি পঞ্চায়েতের মাধ্যমে জমিদারি দেখাশোনা করতেন। নবাব আবদুল গণির পূর্বপুরুষ ছিলেন কাশ্মিরী। এ কারণে মুসলিম অনুভূতি প্রখর ছিল। ঢাকায় কোরবানির প্রচলন হলে তিনি বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে দেবীদাস লেন ঘাটের খাসজমিতে গরুর হাট বসিয়েছিলেন। যা গণি মিয়ার হাট নামে পরিচিত ছিল। তবে ভিন্নকথা বলেন কয়েকজন ঢাকাবিদ। এর মধ্যে প্রবীণ ব্যক্তিত্ব ও ঢাকা বিশেষজ্ঞ হাজি আবদুল আউয়াল। রহমতগঞ্জের মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটির প্রতিষ্ঠাকাল থেকে একটানা ৪২ বছর সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। গণি মিয়ার হাটের নামকরণ নিয়ে তার মতে, এ হাট প্রতিষ্ঠা করেন জিঞ্জিরার হাফেজ সাহেব। তিনি ছিলেন ঢাকার অন্যতম বিশিষ্ট জমিদার। তার পুরো নাম মৌলভী আহমদ আলী। তিনি চকবাজারে থাকতেন। যে বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেটিই বিখ্যাত মৌলভীবাজার। তার মতে, জিঞ্জিরার হাফেজ সাহেব বুড়িগঙ্গার পাড়ে বড় কাটরার উল্টোদিকে দেবীদাস লেন ঘাটের খাসজমিতে এই হাটটি বসান। হাফেজ সাহেবের পিতার নাম ছিল গণি মিয়া। তার নাম অনুসারে হাটের নাম হয় গণি মিয়ার হাট।

গণি মিয়ার হাটটি কোথায় বসেছিল এ নিয়েও মতভেদ আছে। এ প্রসঙ্গে জানা যায় ঢাকা বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ আব্দুল কাইউমের স্মৃতিচারণ থেকে। তার এক বর্ণনায় জানা যায়, তিনি নানাবাড়ি ফরাসগঞ্জে থাকতেন। ভাইয়েরা মিলে ফরাসগঞ্জের কাছে গণি মিয়ার হাটে খেলতেন। বর্ষার মৌসুমে সবচেয়ে মজা করতেন। এখন যেখানে গণি মিয়া রোড, সেখানে একসময় গণি মিয়ার হাট বসত। এই হাটকে কেন্দ্র করে দূর থেকে সওদাগরি নৌকা এসে বুড়িগঙ্গার ঘাটে ভিড়ত। বর্ষায় বুড়িগঙ্গা গণি মিয়ার হাটে এসে ঠেকত। এটা ছিল সাপ্তাহিক হাট ও একটি পাইকারী বাজার। এখানে সব পাওয়া যেত। বুড়িগঙ্গায় ভিড়ে থাকা নৌকার ছইয়ের ভিতরে মাঝি-মাল্লাদের রান্না করার দৃশ্য ছিল দেখার মতো।  নাজির হোসেন এবং মোহাম্মদ আব্দুল কাইউমসহ বর্ষীয়ান কেউই গণি মিয়ার হাট সেকালে সপ্তাহের কী বার বসত তা বলেননি। তবে বর্ণনা থেকে জানা যায়, সেই সময় গণি মিয়ার হাটে সুই থেকে শুরু করে হাতি পর্যন্ত পাওয়া যেত। ঢাকা তো বটেই, ঢাকার আশপাশ যেমন কেরানীগঞ্জ, সাভার, নরসিংদী, বিক্রমপুর, নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার মানুষ গণি মিয়ার হাটে আসত।

পুরনো সেই হাট এখন আর নেই। জায়গাটুকু এখন বুড়িগঙ্গার গর্ভে। তবে বছরে একবার নিকটস্থ জায়গাতেই গরুর হাট ঘটা করে বসে। নামও আছে সেই আগের মতোই- গণি মিয়ার হাট। রাজধানী ঢাকার আদি বাসিন্দা সরদার মাওলা বকস সরদারের ছেলে ও ঢাকা কেন্দ্রের পরিচালক মোহাম্মাদ আজিম বকস বলেন, ‘সেই সময়ে আমরা কোরবানির গরু গণি মিয়ার হাট থেকে সংগ্রহ করতাম। বাবা কখনো গরুর হাটে যেতেন না। আমরা মামার সঙ্গে কোরবানির গরু কিনতে যেতাম। সঙ্গে থাকত বাড়ির কয়েকজন কাজের লোক। আমাদের কাছে কোরবানির গরু মানেই ছিল গণি মিয়ার হাটের সাদা গরু। রহমতগঞ্জের চরে ছিল গণি মিয়ার হাট। ঠিক সেই জায়গাটা এখন আর নেই। মনে করতে পারছি না সেই জায়গাটায় নৌকায় পার হয়ে যেতে হতো কি না! জায়গাটা সম্ভবত বুড়িগঙ্গার গর্ভে চলে গেছে। মনে আছে একবার আড়াইশ টাকা দিয়ে একটি খুব বড় গরু কিনেছিলাম আমরা। গরু কিনে বাড়ির কাজের লোকের কাছে দিয়ে আমরা রিকশায় বাসায় চলে আসতাম।’

গণি মিয়ার হাটের ৯০ শতাংশ ক্রেতা ঢাকাইয়্যা মানুষ। ইসলামপুর, চকবাজার, মৌলভীবাজারের বনেদি ব্যবসায়ীরা ছাড়াও রায়সাহেব বাজার, লালবাগ, বংশাল, সুরিটোলা, কসাইটুলি, পোস্তগোলা, উর্দু রোড, রথখোলা এলাকার মানুষ গণি মিয়ার হাট থেকে গরু কেনেন। শত বছরের প্রাচীন এই হাটের প্রধান আকর্ষণ মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের বিখ্যাত গাই গরু। গণি মিয়ার হাটের আরেক আকর্ষণ ‘ভুট্টি’ গরু। দেখতে অনেকটা বাছুরের মতো। কিন্তু দাম স্বর্ণের মতো। গরুর সঙ্গে মানানসই রঙের সাদা লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি পরা বিক্রেতা বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে জানান দেন ভুট্টি গরুর নানান গুণ। তাদের দাবি, এই গরুর মাংসে কোনো আঁশ হয় না। চর্বি কম। খাসির মাংসের চাইতেও সুস্বাদু। ভুট্টি গরু বনেদি মানুষের খাবার। তাই এ হাট থেকে ধনী ব্যক্তিরা মিরকাদিমের গাই গরুর সঙ্গে একটি ভুট্টি গরু কিনতেন।

কালের যাত্রায় হারিয়ে গেছে গণি মিয়ার হাট। তবে এখনো কোরবানি ঈদের আগে দুইদিন বসে হাটটি। মিরকাদিমও আসে। তবে খুবই কম। অনেকেই সন্দেহ করে বলেন, ‘এখন যেগুলোকে মিরকাদিমের গরু বলে চালানো হচ্ছে, সেগুলো আসলে বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা। মুন্সীগঞ্জের কলুরাও আর এই ব্যবসায় নেই।’


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ আগস্ট ২০১৯/তারা


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

তাদের অবদান ভুলবার নয়

২০১৯-১২-১৬ ৮:১৯:৫১ এএম

বীর বাবার তারকা সন্তান

২০১৯-১২-১৬ ৮:১৮:২৭ এএম

রামপুরায় আগুনে পুড়ছে বস্তি

২০১৯-১২-১৬ ২:৫২:৩১ এএম

মহান বিজয় দিবস আজ

২০১৯-১২-১৬ ১২:০৬:০০ এএম

যশোরে হত্যার ঘটনায় ঢাকা থেকে আটক ৭

২০১৯-১২-১৫ ১০:৪৯:২৫ পিএম

মৌলভীবাজার শহরজুড়ে আলোকসজ্জা

২০১৯-১২-১৫ ১০:৪৬:০৫ পিএম

‘সেভ ভেনিস’ ইভেন্টে মার্কিন সেনা

২০১৯-১২-১৫ ১০:৪১:১৪ পিএম