মনু মিয়া মুক্তিযুদ্ধের অনেক ঘটনার নীরব সাক্ষী

প্রকাশ: ২০২০-০৩-১৪ ৮:১৩:৩৩ এএম
মো. তামিম দারী | রাইজিংবিডি.কম

মনু মিয়া। ভালো নাম মনির হোসেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-বেরুনী হলের লন্ড্রিম্যান। বিগত ১৮ বছর তিনি এ কাজ করছেন।

মনু মিয়ার শৈশব কেটেছে রাজশাহীর পাগলা নদীর তীরে। কিশোর বয়সে রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমি থেকে তার লন্ড্রি পেশায় হাতেখড়ি। যৌবনের শুরুতে কাজের সন্ধানে চলে যান কলকাতা। কিন্তু ভাগ্য ফেরেনি। আড়াই বছর পর ফিরে আসেন স্বদেশে। তারপর রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে কাজ করেছেন দীর্ঘ সাতাশ বছর। সেখান থেকে পাবনা ক্যাডেট কলেজে। সেখানে বছর তিনেক কাজ করে চলে আসেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। মওলানা ভাসানী হলে কিছুদিন কাজ করেন। এরপর থেকেই আছেন বর্তমান ঠিকানায়। 

মনু মিয়া শারীরিক প্রতিবন্ধী। ছোট বেলা থেকেই চোখে কম দেখেন। একা পথ চলতে গেলে খুব ধীরে পা ফেলতে হয়। এই প্রতিবন্ধকতা তার কর্মজীবনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। লন্ড্রির কাজ যতটুকু না চোখের আলোয়, তার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞতা দিয়ে করেন। দৈনন্দিন কাজে স্ত্রীর কাছ থেকে সার্বিক সহযোগিতা নেন তিনি।

সাধারণ লন্ড্রিম্যান ছাড়াও মনু মিয়ার আরো একটি পরিচয়, তিনি মুক্তিযুদ্ধের অনেক ঘটনার নীরব সাক্ষী। মুক্তিযুদ্ধের একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করে মনু মিয়া বলেন, তখন রাজশাহীতে পাকিস্তানি হানাদাররা আসতে শুরু করেছে। আমার নানাবাড়ি ছিল নদীর ওপারে। নৌকায় নদী পাড় হচ্ছিলাম; ওই নৌকাতে ছিল নয়জন হানাদার। আমি মাঝির সঙ্গে কথা বলছিলাম, আর তাদের লক্ষ্য করছিলাম। মাঝিকে অভয় দিলাম- তারা বাংলা বোঝে না। হঠাৎ মাঝি আমাকে জিজ্ঞাসা করল- আমি সাঁতার জানি কিনা? বললাম, জানি। এরপর মাঝি আমাকে বলল, নৌকার যেখানে আমি বসে আছি, সেখানে একটা ছিদ্র আছে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা। মাঝি ইশারা দিলেই আমি যেন কাপড়টি সরিয়ে দেই। শুনেই ভয়ে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। তারপরও এক বুক সাহসে ভর করে মাঝির কথামতো কাজ করলাম। নৌকা তখন মাঝ নদীতে। নৌকা চোখের পলকে ডুবে গেল। নয়জন সশস্ত্র হানাদার ডুবে মরল নদীতে।

এর ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ ওরা নিয়েছিল। পরদিন নদীর ঘাটে এসে দেখি ওরা অনেক বাঙালিকে হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দিচ্ছে। কাউকে জবাই করে ফেলে দিচ্ছে। সে এক বীভৎস হত্যাকাণ্ড! 

এ ঘটনার পরেই পরিবার নিয়ে ভারত চলে যান মনু মিয়া। শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। কিছুদিন পর ফিরে আসেন রাজশাহীর ধনীরামপুরে। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন। সেই সময়ের একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, একদিন যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে একদল মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ফিরেছে। তারা হাত-মুখ ধোয়ার জন্য গরম পানি চাইছিল। আমি মাটির হাঁড়িতে পানি গরম করছিলাম। হঠাৎ পানি পড়ে আমার পা পুড়ে যায়; সেই দাগ এখনো আছে।

মুক্তিযুদ্ধের এমন অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে মনু মিয়ার গল্পের ঝুলিতে। যদিও এর কোনোটিই গল্প নয়, বাস্তব ঘটনা। হলের ছেলেদের প্রায়ই তিনি এগুলো শোনান। কিন্তু স্বাধীনতার পর তার মুক্ত জীবনের গল্প আর শোনা হয় না। একদিন চেপে ধরতেই মুচকি হেসে বললেন, কি  বলব? ১৯৮৪ সালে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলেমেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করেছি। ছেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি পড়াশোনা শেষ করে ভালোই আছে।

মনু মিয়া দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে রাখতে পারেন না। জানা গেল, ছেলে বিয়ে করে আলাদা থাকে। বাবা-মার খোঁজ নেয় না। তবে মেয়ের কথা শুনতে চাইতেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল মনু মিয়ার মুখ। বললেন, মেয়েকে বড় ঘরে বিয়ে দিয়েছি। ও ভালো আছে, সুখে আছে।

শুধু সুখে নেই মনু মিয়া। বয়স বাড়ছে। চারপাশ ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছে তার।


ঢাকা/মারুফ/তারা


     



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

বিক্ষোভ করে কারখানায় ছুটি আদায়

২০২০-০৩-২৮ ৩:১১:০২ পিএম

করোনা নিয়ে আতঙ্ক না ছড়ানোর আহ্বান

২০২০-০৩-২৮ ২:৫২:৩৪ পিএম

সংক্রমণে চীনকে ছাড়ালো ইতালি

২০২০-০৩-২৮ ২:৫১:৩৯ পিএম