ব্যারিস্টার দম্পতির সাফল্য যেন রূপকথার গল্প

প্রকাশ: ২০১৮-১০-২৮ ৮:৫৭:৪২ এএম
মেহেদী হাসান ডালিম | রাইজিংবিডি.কম

নিজ চেম্বারের ব্যারিস্টার আলামিন রহমান জিকো ও তার স্ত্রী ব্যারিস্টার সাবরিনা জেরিন

মেহেদী হাসান ডালিম : ২০০৫ সাল। উত্তরায় ছোট্ট দুটি রুমে চেম্বার দিয়ে আইন পেশায় নেমে পড়েন ব্যারিস্টার আলামিন রহমান জিকো। বড় হওয়ার আকাশ ছোয়া স্বপ্ন, কঠোর পরিশ্রম  আর নেটওয়ার্কিংয়ে পারদর্শিতার কারণে সফলতা পেতে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি তাকে। মাত্র ১৩ বছরের ব্যবধানে বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানি মাইক্রোসফট, সিসকো, স্টারউড গ্রপসহ ৫ শতাধিক কোম্পানির আইনজীবী  তিনি। জিরো থেকে শুরু হওয়া তার প্রতিষ্ঠিত ল’ফার্ম এফ এম এসোসিয়েটসে ফুল টাইম কাজ করছেন ২৭ জন আইনজীবী। তার আইন ব্যবসার পরিধি দেশের গন্ডি পেরিয়ে চলে গেছে বিদেশেও। ইংল্যান্ড ও ইন্ডিয়ায় ল ফার্মের শাখা খুলেছেন। আবার ইন্ডিয়ার বিখ্যাত ল’ফার্ম ফক্স-মন্ডলের পার্টনারও তিনি।

ব্যারিস্টার জিকো ভালবেসে বিয়ে করেছেন আরেক ব্যারিস্টার সাবরিনা জেরিনকে। স্বামীর সকল কাজ, সকল সফলতার সঙ্গী তিনি। বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলাম ও  ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসির চেম্বারে কাজ করে আসা সাবরনিা নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ও আমেরিকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেছেন। ওই সময়ে ব্যারিস্টার স্বামী-স্ত্রী মিলে বিজনেস ল’এর উপর লিখেছেন `Contemporary theory of business and commercial law’ নামে বই। যা এখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ, এমবিএ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পাঠ্যভূক্ত। উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের বিচারকাজ পরিচলনা দেখে মুগ্ধ সাবরিনাও হতে চান বিচারপতি। অন্যদিকে বাংলাদেশে সমাজে টর্ট  আইনকে প্রতিষ্ঠিত আকার দিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে চান ব্যারিস্টার আলামিন রহমান জিকো।

অল্প সময়ের ব্যবধানে সফলতা পাওয়ার রহস্য, জীবনের না বলা কথা, ভবিষ্যত পরিকল্পনা, আরো নানান অজানা বিষয়ে এই প্রথম গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন এই ব্যারিস্টার দম্পতি।  সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাইজিংবিডির সুপ্রিম কোর্ট প্রতিবেদক মেহেদী হাসান ডালিম।


নিজ চেম্বারে এসোসিয়েটসদের সঙ্গে ব্যারিস্টার দম্পতি


রাইজিংবিডি: জীবনের সোনালী দিনের গল্প …
ব্যারিস্টার আলামিন রহমান জিকো: আমার জন্ম ঢাকার সোবহানবাগে। বাবা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। সেই সুবাদে সোবহানবাগের অফিসার্স কোয়াটার্সেই বড় হয়েছি। আম্মাও সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। পরিবার পরিকল্পনা থেকে অবসর নিয়েছেন। গ্রামের বাড়ি নড়াইলের লোহাগড়ায় মধুমতির পাড়ে। আমরা দুই ভাই। আরেক ভাই ব্যবসা করছেন। স্কুল ছিল সাউথ ব্রিজ স্কুল। স্কুলে শিক্ষকরা বলতেন খুব ডানপিটে। বাবা মা বলতেন ছেলে বাসায় খুব সহজ সরল। ক্লাসে চঞ্চল ছেলেদের সাথে বেশি সখ্য ছিল। এমনও দিন গেছে ক্লাসের সময় বাইরেই কেটে গেছে।

১৯৯৯ সালে প্রাইভেটে ও লেভেল পাশ করার পর ২০০১ সালে এ লেভেল করলাম মাস্টারমাইন্ড থেকে। তারপর ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের আন্ডারে নিউ ক্যাসেল একাডেমি থেকে এলএলবি করলাম। এরপর তো বার এট ল’পড়ার জন্য ইংল্যান্ডে চলে যাই।

ব্যারিস্টার সাবরিনা জেরিন: বাড়ি ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার কামার গ্রামে। বাবা ক্যাপ্টেন নওশের আলম, প্রথমে ডিফেন্সে ছিলেন। পরে অবসর নিয়েছেন বিসিআইসি থেকে। আমার মা কলেজের শিক্ষক ছিলেন। উনিও এক বছর আগে অবসর নিয়েছেন। আমরা দুই বোন। ছোট বোন নওশিন জেরিন এমবিএ শেষ করে এখন মালয়েশিয়ায় আছেন। আমার স্কুল গ্রীণ হেরাল্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল। ২০০১ সালে এ লেভেল পাশ করি। ২০০৩ সালে ও লেভেল পাশ করি। ও লেভেল শেষ করে ইংল্যান্ডে চলে যাই। ইউনিভার্সিটি অব ওয়েষ্টমিনিস্টার থেকে এলএলবি অনার্স করি। নর্দাম্বিয়া থেকে বার করি। ২০০৭ সালে ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরি।

রাইজিংবিডি: ব্যারিস্টার হওয়ার অনুপ্রেরণা কোথায় পেলেন ?
ব্যারিস্টার আলামিন রহমান জিকো: আসলে ব্যারিস্টার হওয়ার কোন ইচ্ছাই আমার ছিল না। আমার ইচ্ছা ছিল যে আমেরিকার কালিফোর্নিয়াতে পড়াশোনা করতে যাবো। আমার বাবা তখন ডিসিশন নিয়ে বললেন, তুমি ল’ই পড়বা। আমার কিন্তু এর মধ্যে আমেরিকা যাওয়ার অফার চলে এসেছে। তখন আর কি করা, আমি ল’ তে ভর্তি হয়ে গেলাম। ল’ যখন পড়া শুরু করলাম তখন দেখলাম ভালই তো লাগছে। ল’ পড়া চালিয়ে গেলাম। ২০০১ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত এলএলবি করলাম। ২০০৪ সালে আমি বার করার জন্য প্রথমবার ইংল্যান্ডে গেলাম। আমার আপন খালাতো ভাই ব্যারিস্টার ওমর সাদাত। তিনি আমাকে নিউ ক্যাসেল শহরে নিয়ে গেলেন। ওখানে গিয়ে হলে থাকতাম। বিভিন্ন দেশের বন্ধু-বান্ধব জুটলো। সবার সঙ্গে যখন পরিচয় হয়ে গেল তখন তো ভালই লাগতো। এভাবেই দিনগুলো কেটে গেল। ২০০৫  সালে বার করে দেশে ফিরলাম।

ব্যারিস্টার সাবরিনা জেরিন : আমি যখন কেজি ওয়ানে পড়ি তখন থেকেই জানি আমি ব্যারিস্টার হবো। আমার বাবার শখ ছিল আমাকে ব্যারিস্টার হিসেবে দেখার। বাবার আগ্রহ থেকে আমার নিজের মধ্যে আগ্রহটা জন্ম নেয়। কারণ, আমি দেখতাম  স্কুলে আমি ডিবেটে ভাল করছি। নাচ গান সব কিছুতে ভাল করতাম। আমার ব্যারিস্টার হওয়ার পেছনে বাবার অনুপ্রেরণা সবচেয়ে বেশী। আমি সার্থক যে, আমার বাবা ব্যারিস্টার হওয়া দেখে গেছেন। ২০১৫ সালে হজে গিয়ে আমার বাবা মারা যান।
 

ব্যারিস্টার আলামিন রহমান জিকোর সঙ্গে কথা বলছেন রাইজিংবিডির প্রতিবেদক মেহেদী হাসান ডালিম


রাইজিংবিডি: আপনাদের প্রেম-ভালবাসা-বিয়ের গল্প জানতে চাই ...
ব্যারিস্টার সাবরিনা জেরিন: জিকোর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়  ২০০১ সালে একটা এনগেজমেন্ট অনুষ্ঠানে। যেখানে ওর বাবা এসে আমাকে বলে মা তোমার সঙ্গে তো পরিচয় হল না। আমি পরিচয় দিলাম। দেখা গেল উনারা আমাদের আত্মীয়। আমাকে জিজ্ঞেস  করলেন তুমি কি হতে চাও, আমি বললাম আমি বড় হয়ে লইয়ার হতে চাই। তখন উনি জিকোকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, এটা আমার ছেলে। ও ল’তেই ফাস্ট ইয়ারে পড়ে। সেই তার সাথে পরিচয় ও সেখান থেকেই কথা। ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে জিকো লন্ডনে গেল। ও নিউ ক্যাসেল থাকতো। আমি লন্ডনে থাকতাম। বিশেষ বিশেষ ওকেশনে ও ফোন দিত। হঠাৎ ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি ১ তারিখ রাতে ম্যাসেজ করতে করতে ও বলে ফেলল ‘উইল ইউ ম্যারি মি’। আমি খুব অবাক হলাম। ‘ম্যারি মি’ লিখেছে অথচ আমি জানিই না এই ছেলে আমাকে পছন্দ করে। তারপর সারা রাত গল্প করে ভোরের দিকে আমি ইয়েস বলে দিলাম। সেই থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতাম। এভাবেই ভালবাসা ও বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলাম। ২০০৮ সালে আমাদের বিয়ে হয়। এখন আমাদের দুই ছেলে। বড় ছেলে জায়ান আলামিন রহমান। স্যার জন উইলসনে ক্লাস থ্রি’তে পড়ে। আর ছোট ছেলে জাহান আলামিন রহমান। সবে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে।

রাইজিংবিডি: আইন পেশা শুরুর গল্পটা …
ব্যারিস্টার আলামিন রহমান জিকো: ২০০৫ সালে বিদেশ থেকে    বার এট ল করে আসি। ওই সময় আমার বাবা না ফেরার দেশে চলে গেলেন। বাবা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। অনেক মহলেই তার যাতায়াত ছিল। সে সুবাদে ভেবেছি বাবা আছেন, দেশে আসার পর বাবাই সব কিছু করে দেবেন। বাবা মারা যাওয়ায় সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। এসে আমি দেখি কোন কিছুই নেই। বলতে গেলে জিরো থেকে শুরু করলাম। তখন আমরা উত্তরায়  থাকতাম। উত্তরায় আমাদের বাসার নিচে জাস্ট ছোট্র দুটি রুম নিয়ে চেম্বার শুরু করলাম। উত্তরাও তখন মোটামুটি নবীন। উত্তরাতে ভাল সাড়া পেলাম। আমি একাই ছিলাম লইয়ার। আমার এক ফুফাতো ভাইকে বললাম তুমিও আমার সঙ্গে যোগ দাও। যদি কিছু করতে পারি তাহলে একসঙ্গে বড় হবো। এভাবেই শুরু। আব্দুল মতিন খসরু স্যারের চেম্বারেও কিছুদিন কাজ করেছি।

আমার ২০০৭ সালে লোয়ার কোর্ট এবং ২০০৯ সালে হাইকোর্টে এনরোলমেন্ট হয়। আপিল বিভাগেও আমার প্র্যাকটিস করার পারমিশন আছে।

ব্যারিস্টার সাবরিনা জেরিন: ২০০৭ সালে ব্যারিস্টারি করে এসে প্রথমে ব্যারিস্টার এম আমির উল ইসলাম স্যারের চেম্বারে প্র্যাকটিস শুরু করি। এটা একটা ওয়ান্ডারফুল এক্সপেরিয়েন্স ছিল। তারপর ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি স্যারের চেম্বারে জয়েন করি। এখানে এক থেকে দেড় বছরের মত ছিলাম। এর মধ্যে আমার বিয়েও হল। আমি আবার পার্টটাইম নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কয়েক বছর শিক্ষকতা করেছি। ওই সময়ে আমি আর জিকো মিলে একটা বইও লিখেছি। বাংলাদেশে যত বিজনেস ল পড়ানো হয়, সব ইন্ডিয়ান বই পড়ানো হত। আমরা  প্রথম  প্রথম বিজনেস ল’র ওপর বইটা বের করি। Contemporary theory of business and commercial law’ বইয়ের নাম। এটা এখন অনেক ইউনিভার্সিটির টেক্সট বই হিসেবে পড়ানো হয়। এখন তো আমি এফ এম এসোসিয়েটস এর পার্টনার হিসেবে আছি।

রাইজিংবিডি: ব্যারিস্টার জিকোকে প্রশ্ন, আপনি যে বললেন  জিরো থেকে শুরু সে বিষয়ে বলুন ...
ব্যারিস্টার আলামিন রহমান জিকো: উত্তরায় ছোট্ট দুটি রুমে চেম্বার শুরু করলাম। আমি একা লইয়ার। আমার ফুফাতো ভাই মামুন ভাইকে সঙ্গে নিলাম।

তারপর একজন, দুইজন স্টাফ নেওয়া শুরু করলাম। আমার মনে আছে, প্রথম একজন জাপানি মক্কেল পেলাম। জাপানি মক্কেল আমাদেরকে মাসিক একটা করে রিটেইনার দেবেন বলে চুক্তি করলেন। দেখলাম ওই টাকায় আমাদের অফিসের ভাড়ার খরচ আর যাতায়াতের খরচ হয়ে যাবে। ভাবলাম নিজে তো না খেয়ে মরবো না। ভাগ্য ফেভার করলো। শুরু হল জীবনের নতুন দিগন্ত। তারপর আল্লাহর রহমতে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন আমরা বিশ্বখ্যাত কোম্পানি  মাইক্রোসফটের কাজ করি, সিসকোর কাজ করি। আমরা স্টারউড গ্রুপের কাজ করি। এই গ্রুপের অধীনে ওয়েস্টিন হোটেল আছে, লে মেডিয়ান আছে। ইউ এস বাংলার সঙ্গে কাজ করি। বিদেশী ক্লায়েন্টের সঙ্গে আমরা বেশি কাজ করছি। জাপান, আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, কোরিয়া এসব দেশে আমাদের ক্লায়েন্ট বেশি। মোটামুটি পৃথিবীর ফরচুন ফাইভ হ্যান্ড্রেড কোম্পানি বলতে আমরা যেটা বুঝি সেটা। ফরচুন ফাইভ হ্যান্ড্রেড কোম্পানি বাংলাদেশে যারা আছে অনেকের সঙ্গেই আমরা কাজ করছি। এখন  ক্লায়েন্টরাই  আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ক্লায়েন্টদের স্বার্থেই চেম্বার উত্তরা থেকে বাংলামোটর, তারপর ২০১৫ সালে নিকেতনে শিফট করলাম। বর্তমানে আমাদের এই নিকেতনের অফিসে ২৭ জনের মতো কাজ করছি। আমাদের পার্টনার ৪ জন। আমি, সাবরিনা, ব্যারিস্টার সার্জন ও ব্যারিস্টার বেলাল। তারপর আমাদের সিনিয়র এসোসিয়েটস আছে এবং  এসোসিয়েটস আছে। আমাদের সিনিয়র কনসাল্যান্ট হিসেবে কাজ করেন প্রাক্তন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু স্যার।
 

ব্যারিস্টার সাবরিনা জেরিনের সঙ্গে কথা বলছেন রাইজিংবিডির প্রতিবেদক মেহেদী হাসান ডালিম


রাইজিংবিডি: আপনারা মূলত ক্লায়েন্টদের কি ধরণের আইনি সেবা দিয়ে থাকেন ?
ব্যারিস্টার আলামিন রহমান জিকো-ব্যারিস্টার সাবরিনা জেরিন: আমরা বেসিক্যালি ফুল স্যার্ভিস ল ফার্ম। ক্লায়েন্ট যখন আমাদের কাছে আসবে তখন তারা সব সার্ভিসই পাবে। আমাদের বেশি কাজ ধরুন রিট, সিভিল বা কোম্পানি। কিন্তু তার মানে এই না যে, আমরা ক্রিমিনাল মামলা করি না। সবই করি। আমাদের ফার্মের ইংল্যান্ডে অফিস আছে, ইন্ডিয়ায় অফিস আছে। যেমন ধরুন, মাইক্রোসফটের সঙ্গে আমরা ডে টু ডে লিগ্যাল ওয়ার্ক  করছি। এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে নিয়মিত কাজ থাকেই। ইনস্যুরেন্সের অনেক ক্লেইম থাকে। আমরা অনেক ইনস্যুরেন্সের লইয়ার। যেমন, ইউ এস বাংলার যে প্লেন দূর্ঘটনা হল। ওভারঅল ক্লেম যেটা তা হলো ‘এতজন মানুষ মারা গিয়েছে।’ ওরা আমাদেরকে যে দায়িত্ব অর্পণ করেছে তা হলো যে, সবার ক্ষতিপূরণের বিষয়টা সেটেলমেন্ট করে দিতে হবে।

রাইজিংবিডি: দেশের বাইরে আপনাদের চেম্বারের শাখা আছে, সে বিষয়ে যদি বলতেন …
ব্যারিস্টার আলামিন রহমান জিকো-ব্যারিস্টার সাবরিনা জেরিন: আমাদের চেম্বারের ১২টা অফিস আছে ইন্ডিয়াতে। সেখানে আমাদেরটা ওয়ান অব দা বিগেস্ট ল ফার্ম। প্রায় ৭৫ জন আইনজীবী এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইন্ডিয়ায় আমাদের ফার্মের নাম ফক্স-মণ্ডল। ফক্স একজন ইংলিশ লইয়ার ছিলেন। মণ্ডল ছিলেন একজন বাঙালি লইয়ার। এভাবেই নামটা আসলো। ১৮৯৬ সালে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়। ফক্স মণ্ডল তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকেও এডভাইস করেছে। ফক্স-মণ্ডল যেটা সেটার আমরা ৪ জনই পার্টনার। এটা তো গ্লোবাল পার্টনারশিপ। লন্ডনেও আমাদের ল’ ফার্ম রয়েছে।

রাইজিংবিডি: ১৩ বছরের ব্যবধানে এত সফলতা, এই সফলতার রহস্য বলবেন কি?
ব্যারিস্টার আলামিন রহমান জিকো: আমি তো মনে করি কঠোর পরিশ্রমই আজকে আমাদের এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। পরিশ্রমটা খুব ইমপরটেন্ট। পরিশ্রমের সঙ্গে আপনার ভয়েস রেইস করতে হবে।  যে ফোরামে যেভাবে ভয়েসটা রেইস করা দরকার এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনার নেটওয়ার্কটাও গুরুত্বপূর্ণ। আমি একটা জিনিস বিশ্বাস করি, আপনি যেটা হতে চান সেটা হতে পারবেন। আপনার সেই ইচ্ছাটা থাকতে হবে এবং কাজটা ওইভাবেই করতে হবে। একটা কথা আছে, যেসব স্বপ্ন শুনে মানুষ জন হাসে না সেটা তো স্বপ্ন নয়। আমি ওই কথাটা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি।

রাইজিংবিডি: মামলা সংক্রান্ত বিশেষ কোন স্মৃতি, যা প্রেরণা যোগায় …
ব্যারিস্টার আলামিন রহমান জিকো: আমি বেশ কয়েকটা আরবিট্রেশন ইনফোর্সমেন্টের  মামলা করেছি। কিছু দিন আগে ইংল্যান্ডের একটি কোর্ট আমার কাছ থেকে এক্সপার্ট ওপেনিয়ন নিল। নেওয়ার পর কোর্ট আলটিমেটলি ডিসিশন দিল। কোর্টের সামনে এক্সপার্ট ওপেনিয়ন দুইজন দুই রকমের দিয়েছিলাম বাংলাদেশে থেকে। কোর্ট আমার আর্গুমেন্টটাই গ্রহণ করলো। সিঙ্গাপুর ও ইন্ডিয়াতে বেশ কিছু আরবিট্রেশন করেছি। এটা নিয়ে আমার একটা আত্মতুষ্টি আছে।

ব্যারিস্টার সাবরিনা জেরিন :  প্রথম মামলাটাই আমার ছিল ভেরি কমপ্লেকেটিভ কেস। ডাকাতির মামলায় মার্ডার। ওই মামলায় পেন্ডিং আপিলে জামিন করা দরকার ছিল। আমার মনে আছে মামলাটা শুনানির এক সপ্তাহ আগে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে প্র্যাকটিস করতাম। যেভাবে জজের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হবে। কোর্ট বসার আগে সকালে গিয়ে আমি ডায়াসে দাঁড়িয়েও প্র্যাকটিস করেছি। বিচারপতি আব্দুল হাইয়ের কোর্টে প্রায় এক ঘণ্টা সাবমিশন রেখেছিলাম। উনি এত পছন্দ করেছিলেন যে, আমাকে বলেছিলেন, এরকম কনটিনইউ করতে পারলে ভবিষ্যতে তুমি ভাল করবে। আদালত আমার পক্ষে আদেশ দিয়েছিলেন। নাইস এক্সপেরিয়েন্স ছিল সেটা।

রাইজিংবিডি: আইন পেশা নিয়ে আপনার স্বপ্ন, পরিকল্পনা বলুন ...
ব্যারিস্টার আলামিন রহমান জিকো: আমার খুব ইচ্ছা বাংলাদেশে টর্ট ল’টাকে প্রতিষ্ঠিত করা। যেটাকে ডিউটি অব কেয়ার বলা হয় এবং মেডিক্যাল নেগলিজেন্স এগুলো নিয়ে কাজ করা।

এই যে আজকাল দূর্ঘটনায় বিভিন্ন প্রবলেম ফেস করছি। যদি টর্ট ল চলে আসে তাহলে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের জন্য কাজে আসবে। কোন দূর্ঘটনা হলে মামলা করতে হবে। একটা আইন থাকতে হবে, নীতিমালা থাকতে হবে যে, দূর্ঘটনায় মারা গেলে এই ক্ষতিপূরণ পাবে, অঙ্গহানি হলে মিনিমাম এই ক্ষতিপূরণ পারে। নীতিমালাতেই সুনির্দিষ্টভাবে বলা থাকবে এই ক্ষেত্রে এত টাকা প্রযোজ্য। ইংল্যান্ডে কিন্তু এ রকম নীতিমালা আছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আছে। এই রিপ্রেজেনটেশনটা সবার জন্য খুব ইমপোর্ন্ট্যান্ট। আমি অলরেডি নীতিমালার ব্যপারে কাজ শুরু করেছি।  নিজেদের স্বার্থেই আমাদের এই নীতিমালা করতে হবে।
 

বিদেশ ভ্রমণে দুই ছেলেসহ ব্যারিস্টার দম্পতি


ব্যারিস্টার সাবরিনা জেরিন: ছোটবেলা থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল ব্যারিস্টার হয়ে প্রাইম মিনিস্টার হবো। কিন্তু আমি যখন হাইকোর্টে প্র্যাকটিস শুরু করলাম তখন জজদের দেখে জজ হওয়ার জন্য পাগল হলাম যে, আমি জজ হবো। আমি নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেই জজ হতে চাই। আমার কাছে এটা খুবই নোবেল পেশা,ইউনিক পেশা মনে হয়। আমার জীবনের বড় ইচ্ছা একজন ভাল জজ হওয়া।

আমি জাস্টিস ফারাহ মাহবুব ম্যাডাম, জাস্টিস নাইমা হায়দার ম্যাডামকে দেখে মুগ্ধ হই। জাস্টিস ফারাহ মাহবুব তো অসাধারণ একজন মানুষ, অসাধারণ একজন জাজ। তিনি যদি কাউকে কাউকে বকাও দিতে চান সেটাও খুব কস্টে হাসি মুখে দেন।

জাস্টিস ফারাহ মাহবুব ম্যাডামের কোর্টে আমার যেটা ফাস্ট এক্সপেরিয়েন্স সেই মামলা রিলিফ পাওয়ার মত না। আমাকে শুধু বলেছিল তোমার নাম কি। আমি বলেছি সাবরিনা। ম্যাডাম বললেন, তোমাকে আজ রিলিফ দিতাম না। তুমি এত সুন্দর করে মুভ করেছো, এই প্রোপারলি মুভ করার কারণে রিলিফ দিলাম। এভাবে ম্যাডাম শুধু আমাকে নয়, সব নতুন আইনজীবীকেই উৎসাহিত করেন।

জাস্টিস নাইমা হায়দার ম্যাডামের বিচারকাজ পরিচালনার ধরণ আমাকে সবসময় মুগ্ধ করে। আমি জিকোকে বলি দেখো ম্যাডাম  কত অল্প সময়ে একটি মামলা দেখে ডিসপোজাল করে দেন। সেকেন্ডে মামলার মেরিট বুঝে যান। খুব ইনসপায়ারিং নাইমা আপা। তারা আমার আইডল।

রাইজিংবিডি: যারা আইন পেশায় আসতে ইচ্ছুক বা ভাল করতে চায় তাদের কি করা উচিত বলে আপনি মনে করেন ?
ব্যারিস্টার আলামিন রহমান জিকো: শুধু লইয়ারের মত চিন্তা করলে হবে না। চিন্তা করতে হবে একটা লইয়ারের বাইরে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে। একজন বিজনেস ম্যানকে পরামর্শ দিবো শুধু লিগ্যাল এডভাইস দিয়ে ছেড়ে দিলে হবে না। তার জায়গায় থেকে চিন্তা করতে হবে কোনটা করলে উপকার হবে। নতুন যারা আসছে সবাইকে আমি এনকারেজ করি যে, লিগ্যাল রিসার্চটা করবা। ড্রাফটিং ভালভাবে রপ্ত করতে হবে। কীভাবে আপনি ক্লায়েন্ট ডিল করছেন এটাও কিন্তু একটা আর্ট। আমাদের আইনপেশা কিন্তু বিদেশীদের মত না। কঠোর পরিশ্রমের বিকল্প নেই। সিনিয়রকে ফলো করতেই হবে।

ব্যারিস্টার সাবরিনা জেরিন: হার্ডওয়ার্ক তো করতেই হবে। কমিটমেন্ট, ডিসিপ্লিন এগুলোও থাকতে হবে। প্রথমে এক্সপেকটেশনের থেকে এফোর্ড বেশি দিতে হবে। সব কাজ শেখার মানসিকতা থাকতে হবে। প্রথমেই শিখতেই হবে। এর কোন বিকল্প নেই।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৮ অক্টোবর ২০১৮/মেহেদী/শাহনেওয়াজ

     


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

মওদুদের বিরুদ্ধে মামলা চলবে

২০১৯-০৮-২৫ ১১:২৪:৪১ এএম

মাহি বি চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদ

২০১৯-০৮-২৫ ১১:০২:৫৪ এএম

ডেঙ্গু জ্বরে গৃহবধূর মৃত্যু

২০১৯-০৮-২৫ ১০:৩৮:৩৮ এএম

গ্যাস নিয়ে দিন-রাত কানামাছি

২০১৯-০৮-২৫ ৯:২৩:০২ এএম

টিভিতে আজকের খেলা

২০১৯-০৮-২৫ ৮:৩৭:৫৯ এএম

পাঁচ বছর পর জেনেলিয়া

২০১৯-০৮-২৫ ৮:২৯:৪৯ এএম