বিশ্ব পর্যটকের সাক্ষাৎকার

হেরিটেজ ট্যুরিজম ডেসটিনেশন হবে বাংলাদেশ

প্রকাশ: ২০১৯-০৯-০৬ ৭:২৭:১২ পিএম
সাইফ বরকতুল্লাহ | রাইজিংবিডি.কম

এলিজা বিনতে এলাহী

এলিজা বিনতে এলাহী। ঘোরাঘুরি যার নেশা। বিশ্বের ৪৭টি দেশর নাম এরই মাঝে তার ভ্রমণ ডায়েরিতে ওঠেছে। সে হিসেবে তাকে বিশ্ব পর্যটকও বলা যায়। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণ শেষ করেছেন। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার তথ্য সংগ্রহ করেছেন। কাজ করছেন হেরিটেজ ট্যুরিজম নিয়ে। এছাড়া তিনি বাংলাদেশের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়ার বিজনেস বিষয়ক সহকারী অধ্যাপক। তিনি নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সে ‘বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প বিকাশে হেরিটেজ ট্যুরিজমের গুরুত্ব’ নিয়ে গবেষণা করছেন। এশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে বেরিয়েছে তার দুটি গ্রন্থ ‘এলিজাস ট্র্যাভেল ডায়েরি’ ও ‘এলিজাস ট্র্যাভেল ডায়েরি-২। এসব বিষয় নিয়ে ঢাকার মোহাম্পদপুরের বাসায় কথা বলেছেন তিনি। রাইজিংবিডির পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইফ বরকতুল্লাহ।

সাইফ বরকতুল্লাহ : ভ্রমণের শুরুর গল্পটা কীরকম ?

এলিজা বিনতে এলাহী: আমার পরিবার ঘুরতে পছন্দ করে। একদম ছোটবেলায় বিভিন্ন জেলায় ঘুরেছি। আমার মা সংসদ সদস্য ছিলেন। রাজনীতি করতেন। বিভিন্ন জায়গায় যেতেন। আমিও সঙ্গে থাকতাম। তখন থেকেই ঘোরাঘুরির নেশাটা তৈরি হয়। যখন বড় হয়েছি, ছাত্রজীবনে বিভিন্ন দেশের কথা জেনেছি। ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে পড়েছি। সব থেকে আমাকে টানত ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যান। তখন ভাবতাম, এ জায়গাগুলো যদি দেখতে পারতাম। দেশে প্রচুর ঘুরে বেরিয়েছি। বিয়ের আগে আর বিয়ের পরও অনেক ঘুরেছি।

সাইফ: বিশ্বভ্রমণ শুরু হলো কবে ?

এলিজা: ১৯৯৯ সালে নেপালে ভ্রমণের মধ্য দিয়ে আমার বিশ্বভ্রমণ শুরু হয়। এ যাবৎ ৪৭টি দেশ ঘুরেছি। সামনে আরো কয়েকটি দেশ ঘুরার ইচ্ছে রয়েছ। ২০১৬ সালের ১৭ মে বলধা গার্ডেন দিয়ে বাংলাদেশ ভ্রমণ শুরু করি।

সাইফ : এত ভ্রমণের নেপথ‌্যে নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে?

এলিজা: একেক জন এক এক ধরনের কাজ করে মজা পায়। অদেখা বিষয়, অদেখা ঐতিহ্য জানতে আমার ভালো লাগে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ঘুরতে ঘুরতে আমার কাছে মনে হয়েছে সেসব দেশ ট্যুরিজমকে ডেভেলপ করছে। ট্যুরিজমকে ফ্ল্যারিশ করছে তাদের ইতিহাস ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। তাদের দেশে অনেক পর্যটক আসছে। আপনি যদি ইন্ডিয়ার কথা বলেন, ইউরোপ বা উন্নত বিশ্বের কথা বাদই দিলাম, এশিয়ার মধ্যে অনেক দেশ ইতিহাস ঐতিহ্যকে ট্যুরিজমের মাধ্যমে তুলে ধরেছে। নেপাল, ভুটানের অর্থনৈতিক কাঠামো ততটা সমৃদ্ধ নয়। কিন্তু তারা ট্যুরিজমকে ডেভেলপ করেছে, আমরা পারিনি। বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। এগুলো সরেজমিনে ভ্রমণ করে লোকশ্রুতি, লিখিত দলিল, স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্র সঠিকভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার পাশাপাশি স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছি।

সাইফ : বাংলাদেশে প্রজেক্ট শুরু করলেন কখন ?

এলিজা: যেহেতু আমি ভ্রমণ পছন্দ করি, ট্যুরিজমের বিভিন্ন দিক আমাকে টানত। আমার কাছে মনে হতো আমাদের দেশে কেন মানুষ আসে না- এসব বিষয় চিন্তা করেই ট্যুরিজম প্রজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু করি।

সাইফ : কেউ শখ করে ভ্রমণ করে, কেউ দেখার জন্য ভ্রমণ করে। আপনি একটি বিষয় নিয়ে ঘুরছেন। এই আইডিয়াটা কীভাবে পেলেন?

এলিজা: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য তুলে ধরে পর্যটনের মার্কেটিং করছে। পর্যটকদের আকর্ষণ করা হচ্ছে হেরিটেজ ট্যুরিজমের মাধ‌্যমে। এই ব্য়িটি এশিয়া, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আমি লক্ষ‌্য করেছি। আমি যে ৪৭ দেশে গিয়েছি সব দেশেই হেরিটেজ ট্যুরিজম অনেক উন্নত। আমাদের দেশে শুধু বলা হয় কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি। এখানে তো আমাদের দেশের পর্যটকরা যাচ্ছে। কিন্তু বিদেশিরা তেমন আসছে না। আমাদের তুলে ধরার মতো ইতিহাস ঐতিহ্য কি নেই? সুন্দরবন, মহাস্থান গড়, আহসান মঞ্জিল, বৌদ্ধ বিহারের কথা বলা হয়, কিন্তু এর বাইরে সারা দেশে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা আছে। সরেজমিনে এসব তুলে ধরবার জন্য হেরিটেজ ট্যুরিজম করছি। এই উদ্যোগের নাম দেই ‘কোয়েস্ট : অ্যা হেরিটেজ জার্নি অব বাংলাদেশ’। আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে এটি করছি।

বিভিন্ন জেলার বিষয়ে লেখা বই নিয়ে এলিজা বিনতে এলাহীর বাসায় লাইব্রেরি (ছবি : রাইজিংবিডি)

সাইফ: কোয়েস্ট নামটি কেন বেছে নিলেন?

এলিজা: নিজের জ্ঞান আহরণের জন্য ঘুরছি। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছি। নিজেকে জানা, তথ্য খোঁজা, অনুসন্ধান আমার উদ্দেশ্য। এজন্য কোয়েস্ট নামটি বেছে নিয়েছি।

সাইফ : আপনি ৬৪ জেলা ঘুরে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলোর তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এই কাজ করতে গিয়ে কী কেনো বাধার ‍মুখে পড়তে হয়েছে?

এলিজা : বাধা তো অবশ্যই এসেছে। একা, একজন মেয়ে সারা দেশ ঘুরছে। বিবাহিত না অবিবাহিত, পোশাক- এসব বিষয়ে মানুষের কৌতূহল দেখেছি। অনেক জায়গায় ভিডিও করতে সমস‌্যা হতো। হেরিটেজ ট্যুরিজম কনসেপ্ট অনেকেই বুঝত না। এসব বিষয় ম্যানেজ করে কাজ করতে হয়েছে।

সাইফ: আপনার ভ্রমণে  কোনো টিম থাকে না?

এলিজা: আমার ছোট্ট একটা টিম ছিলো। আমিসহ সদস্য সংখ্যা তিনজন। একজন ভিডিও করতেন। আরেকজন অবশ্য বেশি দিন টিমে ছিলেন না।

সাইফ: প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা নিয়ে আমাদের এখনকার যে প্রজন্ম অনেকেই জানেন না। পত্র-পত্রিকাতেও তেমন কোনো প্রবন্ধ-নিবন্ধ পাওয়া যায় না। বই-পুস্তকও অপ্রতুল। এ নিয়ে কী ভাবছেন?

এলিজা : আমি যেটা করেছি তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি প্রত্যেক জেলার তরুণ সংগঠনগুলোর সাথে মতবিনিময় করেছি। হেরিটেজ ট্যুরিজম, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা কী কী আছে- এসব বিষয়ে তাদের ধারণা দিয়েছি। প্রথম আলো বন্ধুসভা, স্কাউট, ফটোগ্রাফি সোসাইটিসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে এসব বিষয়ে কথা বলেছি। তখন বুঝতে পেরেছি আমাদের দেশে অনেক গর্বের বিষয় আছে। আর হেরিটেজ ট্যুরিজম দিয়ে অনেক উন্নয়ন সম্ভব। স্থানীয় উদ্যেক্তা তৈরি করা যায়। কারণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো সংস্কার করা হলে এর আশে-পাশে হোটেল, রেস্টুরেন্ট হবে। এর মাধ্যমে একইসাথে সেগুলো সংরক্ষিত থাকবে ও আয়ের ক্ষেত্র তৈরি হবে।

সাইফ: হেরিটেজ ট্যুরিজমকে যদি ডেভেলপ করা যায় তাহলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হবে...

এলিজা : অবশ্যই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এটা করছে। হেরিটেজ ট্যুরিজমের মাধ্যমে অনেক দেশ বিপুল রাজস্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলোকে ঘিরে সেই সম্ভাবনা বিপুল। কাজে লাগাতে পারলে অর্থনৈতিক  সমৃদ্ধি আসবে। শিক্ষা-গবেষণা ও পর্যটন শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সাইফ : গত ২৮ আগস্ট আপনি ৬৪ জেলার হেরিটেজ জার্নি শেষ করেছেন। আপনার অনুভূতি?

এলিজা: এই পরিভ্রমণে অনেক কিছু শিখেছি। জেনেছি। আমার ৪৩ বছর জীবনের ট্র্যাভেলার হিসেবে সবচেয়ে বড় পাওয়া এটি।

এলিজার লেখা দুটি গ্রন্থ ‘এলিজাস ট্র্যাভেল ডায়েরি’ ও ‘এলিজাস ট্র্যাভেল ডায়েরি-২ এর প্রচ্ছদ (ছবি : রাইজিংবিডি)

সাইফ: আপনি তো বাইরের অনেক দেশ ঘুরেছেন। আমাদের দেশের পর্যটন ও বিভিন্ন দেশের পর্যটনের মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পেলেন?

এলিজা : পার্থক্য আছে। আমাদের এখানে অবকাঠামোগত অবস্থা আরো উন্নত হতে হবে। বাইরের দেশে ব্যবস্থাপনা অনেক ভালো। কিন্তু আমাদের এখানে তা নেই। ডিজিটাইলাইজেশনের সর্বোচ্চ ব্যবহার আমরা করতে পারছি না। দেখুন ঢাকা ছাড়া অন্য কোনো জেলায় ট্র্যাভেল এজেন্সি কী আছে? হয়ত দু-একটা আছে, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। শুধু তথ্য বাতায়নে কিছু তথ্য আছে। কিন্তু সবার কাছে তা যাচ্ছে না। এজন্য প্রচুর প্রচার প্রচারণা দরকার। অবকাঠামো পরিবর্তন দরকার।

সাইফ: আমাদের দেশেও এখন ট্যুরিজম ফেয়ার হচ্ছে..

এলিজা : আমি আন্তর্জাতিক ফেয়ারগুলোতে দেখেছি। আমাদের দেশে যেটা হচ্ছে আউটবাউন্ড ট্যুরিজমের প্যাকেজ আছে। কিন্তু ইনবন্ড ট্যুরিজমের কোনো প্যাকেজ নাই।

সাইফ: আপনি ৬৪ জেলা ঘুরেছেন। এত বড় জার্নি সময় কীভাবে ম্যানেজ করলেন?

এলিজা : ২০১৬ সালের ১৭ মে জেলা ঘোরা শুরু করি। মাঝে ১৪ মাস নেদারল্যান্ডে ছিলাম উচ্চ শিক্ষার জন্য। সেখান থেকে ফিরে এসে আবার ট্র্যাভেল শুরু করি। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেই। বাকি ছয় দিন ভ্রমণ করার চেষ্টা করি।

সাইফ : ভবিষ‌্যতে আপনার ইচ্ছে কি?

এলিজা : আমার ভিশন হলো বাংলাদেশকে একটি হেরিটেজ ট্যুরিজম ডেসটিনেশন হিসেবে দেখা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ নেপাল, কম্বোডিয়া, ইউরোপের অনেক দেশ হেরিটেজ ট্যুরিজম নিয়ে ভাল কাজ করছে। বাংলাদেশও একদিন হেরিটেজ ট্যুরিজম ডেসটিনেশন হবে। এজন্য আমার কিছু দাবিও আছে। যেমন- হেরিটেজ ট্যুরিজম ইয়ার ঘোষণা করা, প্রতি বছর হেরিটেজ ট্যুরিজম ডে পালন করা। এছাড়া বাংলাদেশের হেরিটেজ সম্পর্কে সবাইকে জানাতে হবে। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ঘুরে দেখতে উদ্বুদ্ধ করতে চাই সবাইকে।

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯/সাইফ/নবীন হোসেন


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

শেষ ভালোর প্রত্যাশায়

২০১৯-০৯-২০ ১:২৯:০৭ এএম

খালেদের বিরুদ্ধে মাদকের আরেক মামলা

২০১৯-০৯-১৯ ১১:৩১:১৬ পিএম