‘একুশে বইমেলাকে আরো আপডেট করতে হবে’

প্রকাশ: ২০২০-০২-২৮ ৯:৪৭:১২ পিএম
ছাইফুল ইসলাম মাছুম | রাইজিংবিডি.কম

ফরিদ আহমেদ। ছবি: ইয়ামিন মজুমদার

মাসব্যাপী বাঙালির প্রাণের উৎসব একুশে গ্রন্থমেলার বড় অংশ পেরিয়ে গেছে। বইমেলার নানান হালচাল নিয়ে জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ও সময় প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদের মুখোমুখি হয়েছেন ছাইফুল ইসলাম মাছুম

মাছুম: বাঙালির প্রাণের উৎসব একুশে বইমেলা। মেলার পরিবেশ সুন্দর রাখতে প্রকাশকদের কী ভূমিকা থাকে?

ফরিদ আহমেদ: প্রকাশকদের মূল ভূমিকা হচ্ছে বই প্রকাশ করা। প্রকাশকেরা সেই ভূমিকাটা পালন করছে।

মাছুম: বইমেলায় স্টল বরাদ্দ পেতে অনেক শর্ত পূরণ করতে হয়। এসব শর্তকে কীভাবে দেখেন?

ফরিদ আহমেদ: বইমেলায় যদি পেশাদারিত্ব নিয়ে আসতে হয়, তাহলে পেশাধারীত্বে কিছু নিয়ম নীতি আছে, সেগুলো পালন করা প্রয়োজন। আমার কাছে এখনো এমন কোনো অভিযোগ আসেনি, যে শর্ত পেশাদারি প্রকাশকদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করেছে। এমন অভিযোগ আসলে আমি বলতে পারতাম, শর্তগুলো নিয়ে কোনো সমস্যা রয়েছে কিনা?

মাছুম: বই প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রকাশকেরা মান সম্মত বইয়ের গুরুত্ব দেন, নাকি কত বেশিসংখ্যক বই প্রকাশ করতে পারবেন সেটা গুরুত্ব দেন?

ফরিদ আহমেদ: প্রতি বছর মেলায় অনেক নতুন লেখকের বই প্রকাশিত হয়। বইগুলো বিক্রিও হয়। মানসম্মত বলেই প্রকাশকেরা ছাপেন, পাঠকেরা বইগুলোকে গুরুত্ব দেন।

মাছুম: গত এক বছরে সময় প্রকাশনী থেকে কতটি বই প্রকাশ পেয়েছে?

ফরিদ আহমেদ: গত এক বছরে সময় প্রকাশনী থেকে ১০০ বই প্রকাশের টার্গেট। এখন পর্যন্ত ৬০-৭০টি বই চলে আসছে।

মাছুম: সারা বছর না করে বইমেলায় লেখক-প্রকাশকদের তাড়াহুড়া দেখা যায় কেন?

ফরিদ আহমেদ: বইমেলা উপলক্ষে বই প্রকাশের অনেক কারণ আছে। সারা বছর যতই কাপড় কিনি না কেন, ঈদের সময় আমাদের নতুন পায়জামা পাঞ্জাবি লাগবেই। এটা যেন নিয়ম হয়ে গেছে। সুতরাং সারা বছর যতই বই বের হোক না কেন, বইমেলাতে লেখকেরা চায় তার একটা বই প্রকাশ হোক। যার সারা বছর প্রকাশ হয়নি, সেও চায় মেলায় তার বই আসুক। বই প্রকাশটা আমি দোষের কিছু দেখি না। তবে এই বই প্রকাশটা মেলার ছয় মাস আগে শুরু করা দরকার। তাহলে বইয়ের প্রতি যত্ন নেওয়া যায়।

মাছুম: বইয়ের বিপণন ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত?

ফরিদ আহমেদ: বাংলাদেশে সৃজনশীল বইয়ের যে বাজারটা আছে, তা আরো পরিকল্পিত হওয়া উচিত। সেই পরিকল্পিত বাজারের জন্য যেটা প্রয়োজন, সেটা হচ্ছে পরিবেশক দরকার। বাংলাদেশে পরিবেশক সিস্টেমটা নেই, পরিবেশক সিস্টেমটায় বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পরিবেশন ব‌্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে বইয়ের একটা সুষমও বাজার হবে। না হলে বইয়ের বাজারটা যেভাবে চলছে, এরকম ভাবেই চলতে থাকবে।

মাছুম: আপনি জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতির দ্বায়িত্বে আছেন। প্রকাশনার মান উন্নয়নে আপনারা কতটা ভূমিকা রাখছেন?

ফরিদ আহমেদ: সমিতি কাজ করছে। প্রকাশক সমিতির কাজ হচ্ছে প্রকাশকদের স্বার্থ দেখা। প্রকাশনার স্বার্থ দেখা। স্বার্থের মধ্যেই মান উন্নয়নটা চলে আসে।

মাছুম: বইমেলাকে কীভাবে আরো বেশি প্রকাশক ও পাঠকবান্ধব করা যায়?

ফরিদ আহমেদ: একুশে বইমেলা প্রতি বছর নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ বছর মেলার আরো আপডেট করেছে, পরিসর বাড়িয়েছে। এটা যদি সফল হয় সামনের বছর এটা বেস ধরে আগামী বইমেলার বিন্যাসটা করবে। আমরা দুই একদিন পরপর বাংলা একাডেমির প্রতিনিধিকে সাথে নিয়ে মেলা ঘুরছি। সমস্যাগুলোকে নোট করছি। ভালোর তো শেষ নেই। আমরা প্রতি বছর মেলাকে আরো ভালো করার জন্য কাজ করছি।

মাছুম: রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বছরব্যাপী বই কেনেন। এক্ষেত্রে বই নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ বলে মনে করেন?

ফরিদ আহমেদ: আমরা বইমেলার রিপোর্টের মধ্যে ছিলাম তো, আমরা বইমেলার রিপোর্টের মধ্যে থাকি। রাষ্ট্রীয়  প্রতিষ্ঠানের জন্য বই কেনার বিষয়টা আরেকটা বিশাল ব্যাপার। সুতারাং ওটা নিয়ে কথা বললে আরো অনেক কথা বলতে হবে।

মাছুম: লেখক থেকে টাকা নিয়ে অধিকাংশ প্রকাশনী বই প্রকাশ করে। এটাকে কীভাবে দেখছেন?

ফরিদ আহমেদ: আমাদের অধিকাংশ বিষয় তো আমদানি নির্ভর। তাই আইডিয়াগুলোও অধিকাংশ বিদেশ থেকে আসে। বিদেশে লেখকেরা টাকা দিয়ে প্রকাশকে সহযোগিতা করে নতুন বই প্রকাশের জন্য। আমাদের দেশেও সেটা হচ্ছে, এটা তো দুইপক্ষের সম্মতিতে হচ্ছে। লেখক নিজেও একজন সাবালক, প্রকাশকও সাবালক। লেখক টাকা দিতে চান, প্রকাশক নেন। অথবা প্রকাশক লেখকের কাছে টাকার ডিমান্ড করেন, লেখক দেন। এখানে তৃতীয়পক্ষের বলার কিছু নেই। প্রকাশক সমিতির সভাপতি হিসেবে উভয়ের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, আপনারা দুইপক্ষ যেভাবে বই প্রকাশ করেন না কেন, একটা শর্ত নির্ধারণ করবেন এবং দুইপক্ষ লিখিত রাখবেন। তাহলে এটা নিয়ে ভুল বুঝাবুঝি, কিংবা অপ্রীতিকর কিছু হবে না।

মাছুম: অন্য যেকোনো প্রকাশনীর থেকে আপনার সময় প্রকাশনীর বিশেষত্ব কী?

ফরিদ আহমেদ: আমি নিজে প্রকাশনীর বিষয়ে যে চিন্তাধারা করি, সে চিন্তাধারাগুলোকে আমি মনে করি আমার নিজস্ব চিন্তা। এবং সেটা অভিনব চিন্তা। বাংলাদেশে অনেক কাজ যেটা আমি শুরু করেছি, সেটা অন্য কোনো  প্রকাশনী করেনি। তারা পরে শুরু করেছে। ৯০ দশকে যখন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর নাম কেউ বলতে চাইত না, তখন একাধারে আমি মুক্তিযুদ্ধের বই করেছি। একটা সময় বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড় শুরু হলো, প্রতিযোগিরা লেখাপড়া করার জন্য বই পায় না, আমি গণিতের বই প্রকাশ করা শুরু করলাম। বিদেশ থেকে বই এনে, অনুবাদ করে করে। এখন অবশ্যই অন্য সব প্রকাশনী থেকেও প্রচুর বের হচ্ছে। আমি এমন অনেক কিছু করেছি, যা করার পর সমাদৃত হয়েছে। কিছুটা ব্যতিক্রমী না হলে সমাদৃত কেন হবে।

মাছুম: বলা হচ্ছে বইয়ের পাঠক কমছে। পাঠক বাড়াতে প্রকাশকদের কেমন ভূমিকা রাখা উচিত?

ফরিদ আহমেদ: পাঠকের সংখ্যা কমছে না। তবে আনুপাতিকভাবে পাঠক কমছে। অর্থাৎ আগে যদি এই বইমেলায় দুই লক্ষ লোক বই কিনতো, এখন কিনে তিন লক্ষ লোক। আগে জনসংখ্যা ছিল ১১/১২ কোটি, ২০ শতাংশ লোক ছিল শিক্ষিত। এখন মানুষ ১৮ কোটি, আর ৮০ শতাংশ লোক শিক্ষিত। আনুপাতিক হারে আগে যদি দুই লক্ষ লোক বই কিনতো, এখন ছয় লক্ষ লোক বই কিনা উচিত। আনুপাতিক হারে বাড়েনি, তবে ক্রেতা বা পাঠক বেড়েছে।

এছাড়া ২০ বছর আগের সমাজ ব্যবস্থা আর ২০ বছর পরের সমাজ ব্যবস্থা এক করলে হবে না। আগে বই পড়ার জন্য বই ছিল ছিল। এখন পড়ার জন্য আরো অনেক কিছু আছে। সুতরাং ভাগ তো কিছুটা হবে। এখন নিজেদের আপডেট হতে হবে। আপডেট অ‌্যান্ড আপগ্রেড। পাঠকের বা বর্তমান জেনারেশনের চাহিদাটা বুঝতে হবে। সেই অনুযায়ী আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে।

মাছুম: একুশে বইমেলায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বাইরে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্টলকে আপনি কীভাবে দেখেন?\

ফরিদ আহমেদ: বাংলা একাডেমি একুশে বইমেলাকে দুটো ভাগই করে নিয়েছেন। একটি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ অন্যটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। উদ্যানে সব পেশাদার  প্রকাশক আর একাডেমি প্রাঙ্গণে সরকারি, আধা সরকারি, রাজনৈতিক সংগঠন, এনজিও এর স্টল রয়েছে। এটা হতেই পারে।

মাছুম: বইমেলার যে সমস্যাগুলোর সমাধান হওয়া দরকার?

ফরিদ আহমেদ: আমি মনে করি আমি যেহেতু প্রকাশনা সমিতির সভাপতির দ্বায়িত্বে আছি। আমি নই, আমাকে লোকজন বলবে, এটার সমাধান করা দরকার। আমরা সেটা সমাধানের উদ্যোগ নেব। আর আমি বলব একুশে বইমেলাকে প্রতি বছর আরো আপডেট অ‌্যান্ড আপগ্রেড করতে হবে।


ঢাকা/সাইফ


     



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

বিক্ষোভ করে কারখানায় ছুটি আদায়

২০২০-০৩-২৮ ৩:১১:০২ পিএম

করোনা নিয়ে আতঙ্ক না ছড়ানোর আহ্বান

২০২০-০৩-২৮ ২:৫২:৩৪ পিএম

সংক্রমণে চীনকে ছাড়ালো ইতালি

২০২০-০৩-২৮ ২:৫১:৩৯ পিএম
রম্যগদ্য

বন্যেরা জনপদে, মানুষ গৃহকোণে

২০২০-০৩-২৮ ১:৪১:১৬ পিএম

করোনা সচেতনতায় আসিফের গান

২০২০-০৩-২৮ ১:৩৪:০৪ পিএম