‘৭ মার্চ প্রত্যেকের চোখে মুখে প্রতিশোধের স্পৃহা ছিল’

প্রকাশ: ২০২০-০৩-০৭ ৯:৪২:৫০ পিএম
হাসান মাহামুদ | রাইজিংবিডি.কম

ছবি: শাহীন ভুঁইয়া

কামাল আহমেদ মজুমদার। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের একজন পরীক্ষিত নেতা কামাল আহমেদ মজুমদার। রাজনীতির সাথে সর্ম্পৃক্ত স্বাধীনতার আগে থেকেই। সক্রিয় ভূমিকা ছিল ১৯৬৯-এর গণঅভুত্থ‌্যানে, সত্তরের নির্বাচনে, সর্বোপরি অংশ নিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। স্বাধীনতার আগে থেকেই ছাত্র সংগঠনের নেতা ছিলেন। ছিলেন ঢাকার কবি নজরুল কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতিও।  বাংলাদেশের ঢাকা-১৫ আসনের সংসদ সদস্য তিনি২০০৪, ২০০৯, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তিনিবর্তমানে পালন করছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের দিন টগবগে তরুণ। উপস্থিত ছিলেন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ‌্যাণ)।  দীর্ঘ ৪৯ বছর পর তিনি সেদিনের ভাষণস্থলে উপস্থিত থাকার অভিব‌্যক্তি প্রকাশ করেছেন রাইজিংবিডির সাথে। কথা বলেছেন হাসান মাহামুদ।

রাইজিংবিডি: বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণে উপস্থিত থাকতে পারার উপলদ্ধি কেমন ছিল?

কামাল আহমেদ মজুমদার: তখন আমি কলেজের ছাত্র। ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম। ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলাম তখন। ৭ মার্চের ভাষণের আগের দিন থেকেই আমাদের ভিতর একটা অস্থিরতা কাজ করছিল। বঙ্গবন্ধু ভাষণে কি বলবেন? কি দিক-নির্দেশনা আমাদের দিবেন? জাতিকে দিবেন? বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনগুলোকে আগের দিনই ভাষণকেন্দ্রিক বিভিন্ন দায়িত্ব দেওয়া হয়। আগের দিন প্রায় সারা দিনই আমরা কোনো না কোনো কমিটির সাথে, ছাত্র সংগঠনের সাথে সভা করেছি, আলাপ করেছি। এভাবেই ৬ মার্চ কেটেছে আমাদের।

বলতে পারি, ৬ মার্চ রাত অনেকেরই বিনিদ্র কেটেছে। সবার মধ্যে উৎকণ্ঠা ছিল কি হতে চলেছে আগামীকাল! কারণ সবার এটা বিশ্বাস ছিল যে, বঙ্গবন্ধু একটি দিক-নির্দেশনা দিবেনই, কিন্তু তারপর কি হতে পারে। সত্যি বলতে তখনকার সেই বৈরি সময়ে কারো কারো কাছে হয়তো এটা ভাবার যৌক্তিকতাও ছিল। কিন্তু যাদের বঙ্গবন্ধুর ওপর অগাধ বিশ্বাস ছিল, তারা ঠিক বুঝতে পেরেছিলেন, কাল পুরো জাতিকে তিনি পথ দেখাবেন।

বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক সেই ভাষণ দিয়েছিলেন দুপুরের পর। কিন্তু মানুষ সকাল থেকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে আসছিলেন ভাষণ শুনবেন বলে। আমরাও সকাল থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। অনেকের মতো বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে কেন্দ্র করে আমা‌র ওপরও কিছু দায়িত্ব ছিল। উদ্যানে উপস্থিত ছাত্রীদের জন্য আলাদা দাঁড়ানোর ব্যবস্থা ছিল। আমার দায়িত্ব ছিল সেখানকার শৃঙ্খলা রক্ষা করা। প্রচণ্ড রোদ সেদিন। এই রোদ উপেক্ষা করে হেঁটে হেঁটেই অনেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উপস্থিত হয়। মেয়েদের, ছাত্রীদের উপস্থিতিও ছিল লক্ষ্যণীয়।

রাইজিংবিডি: সেদিন জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত উপস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

কামাল আহমেদ মজুমদার: সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সেদিন কানায় কানায় ভর্তি। কত লক্ষ লোক ভাষণে উপস্থিত হয়েছিলেন তার সঠিক সংখ্যা হয়তো বলতে পারবো না। তবে সেদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কোনো ফাঁকা জায়গা ছিল না। সর্বত্র লোকে লোকারণ্য। ঢাকার আশপাশ এবং ঢাকার বিভিন্ন অংশ থেকে বিভিন্ন পেশার মানুষ, শ্রমিক আমজনতা সবাই দলে দলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমবেত হয়েছিলেন। প্রত্যেকের চোখে মুখে বিজয়ের একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রতিশোধের স্পৃহা ছিল।

আদমজি থেকে মিছিল নিয়ে অনেক শ্রমিক সেদিনের ভাষণে উপস্থিত হয়েছিলেন। আদমজি থেকে লোকজন না আসলে তখন কোনো সমাবেশ জমতোও না। সেদিন সাইদুর রহমানের নেতৃত্বে আদমজি থেকে মশাল হাতে পায়ে হেঁটে হেঁটে অনেকে উদ্যানে আসে। এছাড়া ঢাকার বাইরের অনেকেও সেদিনের ভাষণে উপস্থিত ছিলেন। তবে ঢাকায় যারা বসবাস করতেন তাদের অধিকাংশ জনই সেদিনের ভাষণে উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ করে আমি বলতে পারি শিক্ষার্থীদের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকাতে তখন যেসব কলেজ ছিল তার ৯০ শতাংশ ছাত্রই সেদিনের ভাষণে উপস্থিত ছিলেন। ছাত্রীদের উপস্থিতিও ছিল অনেক। তখন মেয়েরা খুব বেশি বাইরে বের হতো না। তারপরও বিপুলসংখ্যক মেয়ে এবং মহিলা সেদিনের ভাষণে সশরীরে হাজির হয়েছিলেন। ঢাকার বাইরে থেকে অনেকেই যারা সেদিন ভাষণ শুনতে এসেছিলেন, তারা পায়ে হেঁটে এসেছিলেন। হরতাল চলছিল, তাই প্রায় সব ধরনের গাড়ি চলাচল বন্ধ।

রাইজিংবিডি: ভাষণ পরবর্তী আপনাদের কার্যক্রম বা কর্মসূচি কি ছিল?

কামাল আহমেদ মজুমদার: ঢাকা বেতারে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রিলে করা হয়নি। ভাষণ রিলে না করার প্রতিবাদে বেতারে কর্মরত বাঙালি কর্মচারীরা কাজ বর্জন করেন। সেদিন বিকেল থেকে ঢাকা বেতার কেন্দ্রের সকল অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য সারাদেশের মানুষ অপেক্ষা করছিল। শেষ মুহূর্তে সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে বেতার অচল হয়ে যায়। তখন কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েই অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। গভীর রাতে সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকা বেতারে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পূর্ণ বিবরণ প্রচারের অনুমতি দেয়। বেতারে কর্মরত বাঙালি কর্মচারীদের কর্মবিরতির সেই সাহসী সিদ্ধান্তের পেছনেও কিন্তু কাজ করেছিল বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ। অর্থ্যাৎ ৭ মার্চের ভাষণ টনিকের মতো কাজ করেছিল সর্বক্ষেত্রে। বঙ্গবন্ধুর ভাষ‌ণে আন্দোলনের এবং দেশ পরিচালনার সব ধরনের দিক-নির্দেশনা ছিল। ভাষণের পরপরই আমরা যারা তখন ছাত্র রাজনীতি করি, সবার অ্যাক্টিভিটি পূর্ণ উদ্যমে শুরু হয়। আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হলো যে, ট্রেনিং গ্রহণ করতে হবে। আমি তখন ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির লিয়াকত আলি হলে থাকি।  ট্রেনিং শুরু করি কমান্ডার চিশতির অধীনে। এরপর তো ২৫ মার্চের কালো রাত, ২৬ মার্চ। এক পর্যায়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি।

এখানে একটি কথা বলা দরকার। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের দিক-নিদের্শনাই দিয়ে গেছেন। স্বপ্ন দেখেছেন। আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। জাতির পিতার যোগ্য কন‌্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যোগ্য হাতে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। আমরা আশা করছি বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে তারই কন‌্যার নেতৃত্বে ২০৪১ সাল বাংলাদেশ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হবে।

রাইজিংবিডি: গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন আপনি। শিল্প খাত নিয়ে পরিকল্পনা কী আপনার?

কামাল আহমেদ মজুমদার: আমরা এখন বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। বঙ্গবন্ধুর যোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমাদের উন্নতির যে ধারা, তা অব্যাহত থাকবে আমি আশা করছি। এমনকি ২০৪১ সালে আমরা একটি উন্নত দেশে উন্নীত হবো। এজন্য আমাদের শিল্প খাতের ওপর জোর দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। দেশের চিনিকলগুলোর অবস্থা খুব বেশি ভালো নয়। আমরা এ খাতকে লাভজনক করার পরিকল্পনা হাতে নিয়ে নিয়েছি। কাজ চলছে। পরিসংখ্যান যদি বলি- শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের অধীনে সরকারি খাতে মোট ১৫টি চিনি কল রয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এসব মিলের লোকসানের পরিমাণ এক হাজার ৮ কোটি ৩৮ লাখ ১১ হাজার টাকা। এসব মিলের লোকসান কমাতে জন্য ইতিমধ্যে মিলগুলোতে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে নজরদারি, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে কো-জেনারেশন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সুগার রিফাইনারী স্থাপন, পুরাতন যন্ত্রপাতি পাল্টানো ও সুগারবীট থেকে চিনি উৎপাদনে প্রকল্প গ্রহণসহ কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দেশের চিনি শিল্পকে লাভজনক করার জন্য আমরা আরো বেশকিছু নির্দেশনা দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও সকল সরকারি অলাভজনক শিল্প প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করতে প্রয়োজনীয় সবকিছু করার নির্দেশনা প্রদান করেছেন। ইউরোপের উন্নত যন্ত্রপাতি স্থাপন করে রুগ্ন শিল্প-কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে এগুলোকে লাভজনক করার লক্ষ্যে কাজ করছি আমরা।

শিল্প খাতের অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে বলি- সরকারি শিল্প-কারখানার জমি যাতে বেহাত না হয়ে যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে বলেছি। এসব জমিকে উৎপাদন কাজে ব্যবহারের প্রকল্প গ্রহণ করার কাজ করছি আমরা। সরকারি শিল্প-কারখানাসমূহে লোকসানের পরিমাণ কমিয়ে এনে লাভজনক করতে প্রতিষ্ঠানকে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তির আওতায় আনা হবে।

রাইজিংবিডি: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

কামাল আহমেদ মজুমদার: রাইজিংবিডিকেও ধন্যবাদ।


ঢাকা/হাসান/সাইফ


     



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

রম্যগদ্য

বন্যেরা জনপদে, মানুষ গৃহকোণে

২০২০-০৩-২৮ ১:৪১:১৬ পিএম

করোনা সচেতনতায় আসিফের গান

২০২০-০৩-২৮ ১:৩৪:০৪ পিএম

গোপালগঞ্জ শহরে জীবাণুনাশক স্প্রে

২০২০-০৩-২৮ ১:২২:৩০ পিএম

এ যেনো এক অচেনা শহর

২০২০-০৩-২৮ ১:১৫:২১ পিএম

মমতার পথে হাঁটলেন নুসরাত জাহান

২০২০-০৩-২৮ ১:১৩:৫০ পিএম

ব্রিটেনের রানিও করোনায় আক্রান্ত

২০২০-০৩-২৮ ১:০৮:৩৫ পিএম