কী ঘটেছিলো সেদিন

প্রকাশ: ২০১৯-০৮-২১ ২:০২:৪২ পিএম
এসকে রেজা পারভেজ | রাইজিংবিডি.কম

এসকে রেজা পারভেজ : বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে যে কটি কলঙ্কিত ঘটনায় জাতির গা শিউরে ওঠে তার মধ্যে অন্যতম একটি ঘটনা ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা।

ওই ঘটনায় ২৪ জন লোক নিহত হয় ও তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনাসহ আহত হন পাঁচ শতাধিক লোক। আহত হন সমাবেশ কাভার করতে যাওয়া বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও। যারা আহত হয়েছেন আজও তারা শরীরে গ্রেনেডের স্প্লিন্টার নিয়ে অসহ্য যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছেন।  

সেদিন ছিলো শনিবার। ওইদিন ছিলো গোপালগঞ্জের তুষার হত্যাকাণ্ড ও সিলেটে হযরত শাহজালাল (র:) এর মাজারে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আনোয়ার হোসেনের ওপর হামলার প্রতিবাদে সন্ত্রাস বিরোধী শান্তি মিছিল। হাজার হাজার মানুষের স্রোত সমাবেশে।  প্রায় অর্ধলাখ মানুষের উপস্থিতিতে মহাসমাবেশে রূপ নেয় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের চারপাশ।  সমাবেশ শেষে সন্ত্রাসী বিরোধী মিছিল নিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে যাওয়ার কথা। তাই মঞ্চ নির্মাণ না করে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে একটি ট্রাককে মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

বুলেটপ্রুফ মার্সিডিজ বেঞ্জ চেপে বিকেলে ৫টার একটু আগে সমাবেশস্থলে পৌঁছান বিরোধী দলের নেতা। সমাবেশে অন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্যের পর শেখ হাসিনা বক্তব্য দিতে শুরু করেন।  বিকেলে সাড়ে ৫টার দিকে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে বক্তৃতা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তেই শুরু হলো নারকীয় গ্রেনেড হামলা। বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে লাগল একের পর এক গ্রেনেড। আর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ মুহূর্তেই যেন পরিণত হলো মৃত্যুপুরীতে।

শেখ হাসিনাকে টার্গেট করে একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায় ঘাতকরা।  কিছু বুঝে ওঠার আগেই ১২-১৩টি গ্রেনেড হামলার বীভৎসতায় মুহূর্তেই রক্ত-মাংসের স্তূপে পরিণত হয় সমাবেশস্থল। শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে নেতারা ও তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা মানবঢাল তৈরি করে রক্ষা করেন তাকে।

আরেকটি রক্তাক্ত ১৫ আগস্ট ঘটাতে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে উপর্যুপরি ১৩টি গ্রেনেড মেরেই ক্ষান্ত হয়নি ঘাতকরা, গ্রেনেডের আঘাতে পরাস্ত করতে না পেরে ওইদিন শেখ হাসিনার গাড়িতে ঘাতকরা ছুড়েছিল বৃষ্টির মতো গুলি।  যদিও ঘাতকদের গুলি ভেদ করতে পারেনি শেখ হাসিনাকে বহনকারী বুলেটপ্রুফ গাড়ির কাঁচ। শেখ হাসিনাকে আড়াল করে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে জীবন বিলিয়ে দেন তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী ল্যান্স কর্পোরাল (অব) মাহবুবুর রশীদ।

বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ ওইদিন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। এই ভয়ঙ্কর গ্রেনেড হামলার পর সেদিন স্প্লিন্টারের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন শত শত মানুষ।  কারও হাত নেই, কারও পা উড়ে গেছে। রক্তে ভিজে লাল হয়ে যায় পিচঢালা কালো পথ।  শত শত মানুষের আর্তচিৎকার।  প্রাণ বাঁচানোর সেই অবর্ণনীয় আর্তনাদে করুন দৃশ্যের সৃষ্টি হয় সমাবেশ স্থলে।

সেখানে উপস্থিত নেতাকর্মীরা প্রথমে ভেবেছিলো হয়তো বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ হয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে ভুল ভাঙে তাদের। বুঝতে পারেন বোমা হামলার শিকার তারা। সেদিনের সেই গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলাবিষয়ক সম্পাদক ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হন কয়েকশ নেতাকর্মী।

হামলার পর আহত নিহত নেতাকর্মীদের রেখে ওই স্থান ত্যাগ করতে চাননি শেখ হাসিনা। নেতাকর্মীদের ওই অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। যদিও তার নিরাপত্তার কথা ভেবে নেতারা মানবঢাল তৈরি করে তাকে একপ্রকার জোর করেই গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে বাসায় নিয়ে যান।

আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করতেই সেদিন দলটির সভাপতি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাসহ দলের প্রথমসারির নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে ওই ঘৃণ্য হামলা চালায় ঘাতকচক্র।

ওইদিনের পরিস্থিতি জানাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন গ্রেনেডের স্প্লিন্টার বয়ে বেড়ানো ভুক্তভোগী রাশিদা আক্তার রুমা। রাইজিংবিডিকে তিনি বলেন, ‘সমাবেশে নেত্রীর বক্তব্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দ।  কিছুই বুঝতে পারি নি। কোথায় যেন উড়ে গিয়ে পরলাম। কতক্ষণ ছিলাম জানি না। সন্ধ্যার দিকে আমার কানে কোলাহলের শব্দ শোনা গেলো। তখন আমি চোখ খুলে দেখি রক্ত আর রক্ত।  হাতের আঙ্গুল, বা হাত, দুটো পা ভেঙে গিয়েছিলো। পা ভেঙে হাড় বেড়িয়ে গিয়েছিলো। হাতির পায়ের মতো ফুলে গিয়েছিলো। কিছুক্ষণ পর আবার অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই।’

আরেক ভুক্তভোগী মাহবুবা পারভিন রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘আপা (শেখ হাসিনা) জয় বাংলা বলার সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকা বিকট শব্দের সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার হয়ে যায়।  শুধু চিৎকার আর চিৎকার। আমি দাড়ানো অবস্থা থেকে পড়ে গেলাম। এরপর আর আমার কিছু মনে নেই। সেই গ্রেনেডে শুনেছি আমার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল।’

ওই সমাবেশ কাভার করতে যেসব সাংবাদিক সেখানে ওইদিন ছিলেন তারাও প্রথমে ভয়াবহতার মাত্রা বুঝে উঠতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে এগোতেই তারা দেখতে পান শত শত জুতো, স্যান্ডেল রাস্তায় ছড়ানো। তারই মধ্যে পড়ে রয়েছে মানুষের রক্তাক্ত নিথর দেহ; আহতদের আর্তনাদে ভয়াবহ এক পরিস্থিতি। হামলায় আহতদের সাহায্য করতে আওয়ামী লীগের অন্য নেতাকর্মীরা যখন ছুটে গেলেন, তখন পুলিশ তাদের ওপর টিয়ার শেল ছোড়ে। পুলিশ সে সময় হামলার আলামত সংগ্রহ না করে তা নষ্ট করতে উদ্যোগী হয়েছিল বলেও পরে অভিযোগ ওঠে।

একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়ে গত বছরের ১০ অক্টোবর রায় দেন বিচারিক আদালত। এই রায়ের বিষয়ে হাইকোর্টে আপিল মামলা শুনানীর অপেক্ষায় আছে। বর্তমানে শুনানির জন্য পেপারবুক তৈরির কাজ চলছে।

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ আগস্ট ২০১৯/রেজা/এনএ


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

র‍্যাবের অভিযান

চট্টগ্রামে আলোচিত যুবলীগ নেতা টিনু আটক

২০১৯-০৯-২৩ ১:৩৮:৫০ এএম

নানিয়ারচরে ইউপিডিএফ কালেক্টর আটক

২০১৯-০৯-২৩ ১২:৩১:১১ এএম

ডি ককের ঝড়ে সিরিজ ড্র করল দ.আফ্রিকা

২০১৯-০৯-২২ ১০:৫৩:১৩ পিএম

ভিসির গালিগালাজ করার অডিও ভাইরাল

২০১৯-০৯-২২ ১০:৪৯:১১ পিএম

মুখে তিক্ত স্বাদ অনুভবের ৯ কারণ

২০১৯-০৯-২২ ১০:১২:২৫ পিএম