পরমাণু অস্ত্রের হুঙ্কারে কাঁপছে এশিয়া

প্রকাশ: ২০১৯-০৮-২৮ ১০:৫৮:০৯ এএম
অলোক আচার্য | রাইজিংবিডি.কম

প্রতীকী ছবি

অলোক আচার্য : বিশ্ব একদিকে পরমাণু অস্ত্র ঝুঁকিমুক্ত হতে চাইছে, অন্যদিকে বিভিন্ন সময় পরমাণু অস্ত্রসম্পন্ন দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়াচ্ছে। আর তখনই পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা বাড়ে। বর্তমানে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে পরমাণু অস্ত্র সজ্জিত দুই দেশের যুদ্ধের আশঙ্কায় আবারও পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগের বিষয়টি সামনে এসেছে।

বিষয়টি স্পর্শকাতর এবং আতঙ্কিত হওয়ার মতো। গত বছরও ভারত পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হওয়ায় একই রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কাশ্মীর সংকট থেকে দিল্লী-ইসলামাবাদ পারমাণবিক যুদ্ধের সূত্রপাত হতে পারে বলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে হুঁশিয়ার করা হয়েছে। বিশ্ব গণমাধ্যমে বিষয়টি উঠে এসেছে। বলা হয় কাশ্মীর থেকে দৃষ্টি সরাতে ভারত এমন হামলা করতে পারে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ভারত পাকিস্তান তিনটি যুদ্ধের মধ্যে দুটি হয়েছে কাশ্মীর ইস্যুতে। সম্প্রতি ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মধ্যে দিয়ে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ও বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয়া হয়। এর প্রতিবাদে ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক হ্রাস করার পাশাপাশি ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে বহিষ্কার করেছে পাকিস্তান। বিষয়টি জাতিসংঘ পর্যন্ত গড়িয়েছে। দুই পক্ষই এখন উত্তপ্ত।

ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ হলে কী প্রভাব পরতে পারে তা নিয়ে আগেও আলোচনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন এর ভয়াবহতা। তারপর যদি সেই যুদ্ধে পরমাণু অস্ত্রের প্রয়োগ করা হয় তাহলে পরিস্থিতি হবে আরো ভয়াবহ। গত মার্চ মাসে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সীমিত পর্যায়ে এমন একটি যুদ্ধ হলেও তার প্রত্যক্ষ প্রভাবে দীর্ঘমেয়াদে ২০০ কোটি মানুষ প্রাণ হারাবে। বিপন্ন হবে প্রকৃতি। হুমকিতে পড়বে খাদ্যচক্রসহ সমস্ত প্রাণ। ক্ষুধা-দুর্ভিক্ষ আর দীর্ঘতর পরিবেশ বিপর্যয় ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিবে মানুষসহ অন্যপ্রাণের অস্তিত্ত। কার কাছে কত পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে তা গোপনীয়। ফলে একেবারে সঠিক সংখ্যা বলা যায় না। তবে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনালের  ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতের ১৩০-১৪০টি আর পাকিস্তানের ১৪০-১৫০টি পরমাণু অস্ত্র রয়েছে।

এই দুই দেশ যুদ্ধে জড়ালে তা কেবল নিজেদের ভিতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং তা ছড়িয়ে পরবে প্রথমত এশিয়া এবং কার্যত সারা বিশ্বে। কে জানে এটিই বিশ্বের অন্যতম ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হতে পারে! কে যুদ্ধে পরাজিত হবে আর কে বিজয়ী হবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো যুদ্ধ পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কত বছর সময় লাগবে। যে মারাত্মক পরিবেশগত এবং মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে উভয় দেশ তা কোন উপায়ে মোকাবেলা করা হবে?

পারমাণবিক অস্ত্রের কথা উঠলেই চলে আসে জাপানের নাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ প্রান্তে ১৯৪৫ সালের আগস্টের ৬ ও ৯ তারিখ হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়। সারা বিশ্ব দেখে লিটল বয় ও ফ্যাট ম্যান নামের  সেই অস্ত্রের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ। এই বোমা নিক্ষেপের ফলে হিরোশিমায় ১ লাখ ৪০ হাজার এবং নাগাসাকিতে ৭৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। আমেরিকার পরে দ্বিতীয় দেশ হিসেবে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৪৯ সালে তারা পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। তৃতীয় দেশ হিসেবে ব্রিটেন এই বোমার পরীক্ষা করে। ফলে পৃথিবী বুঝে যায় যে, এই ভয়ঙ্কর অস্ত্র হাতে থাকলে বিশ্বে খবরদারী করা যাবে। এরপর চীন, ফ্রান্স, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হয়। একসময় পৃথিবী বুঝতে পারে এই অস্ত্র বিশ্বের জন্য হুমকী। এই অস্ত্র বিস্তার রোধে চুক্তিও হলো। কিন্তু এটি রোধ করা যায়নি।

পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী বোমা আবিষ্কৃত হয়েছে- হাইড্রোজেন বোমা। এটি পারমাণবিক বোমার চেয়েও সাতশ গুণ বেশি শক্তিশালী। তবে তা কোনো যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়নি। যদি এখন বিশ্বে পারমাণবিক যুদ্ধ হয় তাহলে বিশ্বের এই ভয়ঙ্কর ক্ষতির জন্য সংশ্লিষ্ট কোনো দেশ নিজেদের দায় অস্বীকার করতে পারবে না। জয়ের থেকেও বড় কথা পৃথিবীকে বিপন্ন করে এই জয় পরাজয় কার জন্য? মোট কথা বিশ্ব এখন ভয়ঙ্কর অস্ত্রের ঝুঁকিতে কাঁপছে। কেননা পরমাণু অস্ত্র ধ্বংস ক্ষমতার দিক থেকে অন্য সব অস্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক। বিশ্বে পরমাণু অস্ত্র সমৃদ্ধ দেশের সংখ্যাও কম নয়। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলে পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগের বিষয়টি উঠে আসে। এতে বিশ্বের  অস্তিত্বই হুমকির সম্মুখীন হয়। ছোট এই পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার জন্য যেটুকু অস্ত্র দরকার তারচেয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র পৃথিবীতে মজুদ রয়েছে। বিজ্ঞানের আশীর্বাদে মানব সভ্যতা আজ বহুদূর অগ্রসর হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা যেমন পৃথিবীকে উন্নত করতে পেরেছি, তেমনি নিত্য নতুন অত্যাধুনিক অস্ত্রে নিজেদের সজ্জিত করে সভ্যতাকেই হুমকির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছি। ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো, রুটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালান রোবোক এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের রিক টার্কো ২০০৮ সালে একটি যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছিলেন, ভারত ও পাকিস্তান যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হিরোশিমায় ফেলা বোমার মতো ১৫ কিলোটন ক্ষমতার ৫০টি পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করে তাতে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহত হবে সাড়ে চার কোটি মানুষ। ওয়েন বি টুন ও তার সহযোগীদের ২০১৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারমাণবিক যুদ্ধের ফলে যে খরা দেখা দিবে তার কারণে যুদ্ধের প্রথম পাঁচ বছর বিশ্বজুড়ে শস্য উৎপাদনের হ্রাসের হার হবে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। এশিয়া ট্রেডস দ্য নিউক্লিয়ার পাথ, আনওয়্যার দ্যাট সেলফ অ্যাস্যুর্ড ডেস্ট্রাকশন উড রেজাল্ট ফ্রম নিউক্লিয়ার ওয়ার’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনটিতে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ প্রচন্ড ঠান্ডা, খরা ও খাদ্যাভাবের প্রভাবে প্রাণ হারাতে পারে। এটা আমাদের সফলতা না ব্যর্থতা তা একবাক্যে স্বীকার করার সময় এখনও আসেনি।

তবে একবাক্যে একথা বলতে দ্বিধা নেই আমাদের এই সুন্দর ধরণীর অস্তিত্ব হুমকিতে রয়েছে। বিশ্বের পরাশক্তিগুলো একের পর এক মারণাস্ত্র বানিয়ে পৃথিবীকে হুমকির মুখে ফেলছে। নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে রেখেই যে এটা করছে তা নিশ্চিত। কিন্তু কেবল নিরাপত্তার অজুহাতে একের পর এক আধুনিক মারণাস্ত্র দিয়ে পৃথিবী ভরে ফেলছে- এ কথা পুরোপুরি হয়তো সত্যি নয়। কোনো দিন যদি এই নিরাপত্তার অজুহাতই বুমেরাং হয়ে আমাদের ওপর চেপে বসে তখন মানব জাতি কোথায় আশ্রয় নেবে? অন্য গ্রহে? হলেও হতে পারে। তবে তার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। এক দেশ নতুন কোনো অস্ত্র বানাচ্ছে তো আরেক দেশ তার থেকেও ভয়ঙ্কর কোনো অস্ত্র বানিয়ে নিজেকে সুরক্ষিত করছে। অথচ এই সত্য আজ অনুধাবনের সময় এসেছে- নিজেদের শক্তি এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি পৃথিবীর জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠলে তা মানবকল্যাণে কোনো কাজেই আসবে না। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সবদিক থেকেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে বিশ্ব। তাছাড়া দুই দেশের যুদ্ধাবস্থাকে কেন্দ্র করে বিশ্বযুদ্ধ সংগঠিত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। বিভিন্ন দেশ পক্ষ বিপক্ষে ভাগ হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। বলা হয় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হলে তা বিশ্বের অস্তিত্বকেই ধ্বংস করবে। কারণ এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী দেশগুলোর হাতে মারাত্মক সব অস্ত্র রয়েছে। যুদ্ধে রোবটের ব্যবহারও বাড়ছে। ফলে দুই দেশই যদি সংযত থাকতে পারে তাহলেই মঙ্গল। বিশ্ব পারমাণবিক অস্ত্র শঙ্কামুক্ত হোক এবং নিরাপদ হোক এটাই সবার জন্য মঙ্গল। আমরা আর কোনো হিরোশিমা বা নাগাসাকির মতো পরিণতি দেখতে চাই না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৮ আগস্ট ২০১৯/তারা


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

অবৈধ পথে দেশে ঢুকে ৩ জন কারাগারে

২০১৯-১২-০৬ ৬:৪২:৩৪ পিএম

চাকরিতে বহাল দুই পুলিশ কর্মকর্তা

২০১৯-১২-০৬ ৬:৪০:১৫ পিএম

আগুনে শেষ দুই হাজার মুরগি

২০১৯-১২-০৬ ৬:৩৯:৪৮ পিএম