ডাচ ডিজিজ, ভেনিজুয়েলার প্রেক্ষাপট ভিন্ন

প্রকাশ: ২০১৯-০৯-০৯ ২:০৩:১১ পিএম
রিয়াজুল হক | রাইজিংবিডি.কম

রিয়াজুল হক: ফেসবুকে দেখছিলাম, ভেনিজুয়েলার মুদ্রাস্ফীতি- ডাচ ডিজিজ আর আমাদের দেশের রপ্তানি আয়ের মূল খাত অর্থাৎ আরএমজি’র তুলনা করা হয়েছে। অনেকেই শেয়ার দিচ্ছেন। কিন্তু বিষয়টি যেভাবে তুলনা করা হয়েছে; সে অনুযায়ী যদি বাস্তবায়ন হতো, তবে আমাদের আরএমজি খাত অনেক আগেই ধ্বসে যেত। কিন্তু সেটা হয়নি। বরং আমাদের আরএমজি খাতে আয় বেড়েছে। এর পিছনেও অনেকগুলো কারণ রয়েছে। কেন ডাচ ডিজিজ, ভেনিজুয়েলার সাথে আমাদের তুলনা অযৌক্তিক, খুব সহজে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছি।

এক. ভেনিজুয়েলা বিশ্বের বৃহত্তম তেল মজুদকারী দেশ এবং উৎপাদিত তেলের প্রায় সবটাই রপ্তানি করত। দেশটির সমস্যার শুরু যেন বিশ্ব বাজারে তেলের দরপতন দিয়ে। বিশ্ব বাজারে তেলের দরপতন শুরু হয় ২০১৪ সাল থেকে। অথচ ২০০৪  থেকে ২০১৩, এই সময়ের মধ্যে ভেনিজুয়েলা ছিল বিশ্বে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আহরণ করা দেশগুলোর একটি, যখন তেলের মূল্য বিশ্ব বাজারে অনেক বেশি ছিল এবং বেশি থাকাটাই যেন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বর্তমানে সব তেলভিত্তিক অর্থনীতির দেশই ভুগছে কিন্তু ভেনিজুয়েলার অবস্থা আকাশ থেকে টেনে মাটিতে ফেলে দেওয়ার মতো। বর্তমানে দেশটি যেসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি, হ্রাসমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বাজেট ঘাটতি।

তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাকে কিছুটা দায়ী করা গেলেও বড় দোষটা গিয়ে পড়ে দেশের নেতাদের কাঁধে। তাদের অসামর্থ্যেই মূলত ভুগছে ভেনিজুয়েলা। দেশটির অতিরিক্ত ব্যয় সমস্যা বহু পুরনো। ব্যয়ের বেশির ভাগই হচ্ছিল গোপনে, কিন্তু এর অধিকাংশই আবার প্রকাশ্যে চলে যাচ্ছিল ভোগ স্ফীতি তৈরিতে, যার আসল উদ্দেশ্য ছিল সরকারি দল পিএসইউভির নির্বাচনে জেতার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। ২০১৩ সালে শ্যাভেজ যুগের সমাপ্তি নাগাদ ভেনিজুয়েলার অর্থ ঘাটতি আনুমানিক জিডিপির ১৫ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল। ওই সময়ে অন্য কোনো ওপেক দেশে এমন ঘটেনি। অধিকাংশই তেলের মূল্য বৃদ্ধির সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত আয় রিজার্ভ হিসেবে রেখে দিয়েছিল। কিন্তু ভেনিজুয়েলা ব্যয় কমিয়ে রিজার্ভের দিকে নজর দেয়নি। তেলের মূল্য কমতে শুরু করার আগে ব্যয় কমানো কী জিনিস, ভেনিজুয়েলা যেন ভুলেই গিয়েছিল।

এই শতকের মধ্যভাগ থেকে তেল রিজার্ভ বেড়েছে অথচ উৎপাদন হ্রাস ও বর্ধিত ঋণের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে, এমন গোটাকয়েক রাষ্ট্রের মাধ্যে ভেনিজুয়েলা একটি। এর অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে, প্রশিক্ষিত কর্মীদের বদলে ‘বিপ্লবীদের’ এই খাতে নিয়োগ দেয়া, যারা প্রেসিডেন্টের যেকোনো ইচ্ছা বাস্তবায়নে ব্যাকুল। ফলশ্রুতিতে এখন পর্যন্ত সেখানে রয়ে গেছে উৎপাদনশীলতার সমস্যা। সাধারণত দেখা যায়, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেলে চাকরির সুযোগ তৈরি হয়। সেই হারও ধীরগতির হবে সেটাই স্বাভাবিক। প্রতিষ্ঠান লাভজনক না হলে সেখানে নতুন নিয়োগের সম্ভাবনা থাকে না। ২০০৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কলম্বিয়ার তেল উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ৯২ শতাংশ, কিন্তু চাকরির হার বেড়েছে ৫ শতাংশ। একই সময়ে ভেনিজুয়েলায় তেল উৎপাদন কমা সত্ত্বেও চাকরি বেড়েছে ২৫৬ শতাংশ। এছাড়া অধিক হারে রাষ্ট্রীয়করণ দেশের মুদ্রাস্ফীতির জন্যও দায়ী। প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহ, দারিদ্র্য দূর এবং অসমতাকে ব্যালেন্স দেয়ার জন্য কিছু রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সবকিছু রাষ্ট্রীকরণ করতে হবে এটা কোনভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। অথচ ভেনিজুয়েলায় সেটাই ঘটেছে।

দুই. এবার ডাচ ডিজিজের বিষয়ে আসা যাক। গত শতাব্দিতে ডাচরা প্রাকৃতিক গ্যাস পাবার পরে অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসা শুরু করল। গ্যাস রপ্তানি শুরু হলো। গ্যাস রপ্তানি মোট রপ্তানির ৮০ ভাগ হয়ে গেল। ডাচ মুদ্রার মান ডলারের বিপরীতে বেড়ে গেল। এতে মূল যে সমস্যা তৈরি হলো, ডলারের বিপরীতে ডাচ মুদ্রার মান বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গিয়েছিল এবং রপ্তানির সময় মূল্যমান পাচ্ছিল।  অর্থাৎ আয় কমে যাচ্ছিল। এটাই মূলত ডাচ ডিজিজ। ডাচ ডিজিজ মূলত প্রাকৃতিক সম্পদের উপর অতি নির্ভরতা এবং ভবিষ্যতে এই সম্পদের হ্রাস পেলে যে আর্থিক মন্দার সৃষ্টি হবে তাকেই বুঝিয়ে থাকে।

তিন. ভেনিজুয়েলা কিংবা ডাচ ডিজিজের সঙ্গে আমাদের দেশের তুলনা করা অযৌক্তিক। এর বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যেমন আমাদের আরএমজি সেক্টর মূলত লেবার ইনটেনসিভ খাত। কিন্তু ভেনিজুয়েলা কিংবা নেদারল্যান্ড পুরোপুরি প্রাকৃতিক সম্পদ নির্ভর।

ডাচরা যখন গ্যাস রপ্তানি শুরু করল, তখন তাদের মুদ্রার মান ডলারের বিপরীতে বেড়ে গিয়েছিল। সেটা কিন্তু আমাদের এখানে হয়নি। অর্থাৎ আমাদের রপ্তানি আয় কমার সুযোগ তৈরি হয়নি। এটা অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার দাবি রাখে।

ভেনিজুয়েলার সরকার তাদের স্বার্থে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করেছে, সব কিছুই ছিল রাষ্ট্রীয়করণের আওতায়। কিন্তু আমাদের আরএমজি সেক্টর প্রাইভেট সেক্টরের আওতায়। অর্থাৎ কোন দিক থেকেই তুলনা করা যায় না।

তবে একইসঙ্গে কিছু বিষয় আমাদের মাথায় রাখা উচিত। যেমন রপ্তানি আয়ের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস করার জন্য গভীর সমুদ্র বন্দর প্রয়োজন, যেখান মাদার ভেসেল ( যেগুলো মহাসাগরে চলাচল করে) সরাসরি আসতে পারবে। এতে করে কস্ট প্রডাকশনের সাথে সাথে সময়ের বিষয়টিও জড়িত।

প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ঘন ঘন অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়। এজন্য দ্বিপাক্ষিয় চুক্তি এবং সম্পর্ক উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।

আরএমজি খাতের ফাইনাল প্রডাক্টের জন্য যে ছোট ছোট উপাদানগুলো আমরা আমদানি করি, এগুলোর উৎপাদন যদি আমরা নিজেরা করতে পারি তবে উৎপাদন ব্যয় আরো কমে যাবে। এতে করে মোট রপ্তানি আয় আরো বেড়ে যাবে।

আরএমজি সেক্টরের সাথে সাথে আমাদের সাবস্টিটিউট খাতেও এগিয়ে যেতে হবে।

জিএসপি বাতিল হয়েছে।  সামনে আমাদের জন্য আরো বড় বড় চ্যালেঞ্জ আসবে। পরিবর্তিত সেই সময়ের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।  একইসঙ্গে কারিগরি উন্নয়নের দিকেও সবসময় খেয়াল রাখতে হবে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯/তারা


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

টিভিতে আজকের খেলা

২০১৯-১১-২১ ৯:০৯:১৭ এএম

ঘের ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা

২০১৯-১১-২১ ৮:৩৭:২২ এএম

একসঙ্গে তারা তিনজন?

২০১৯-১১-২১ ৮:২২:৪২ এএম

মাছির বিষে যে গ্রামে সবাই অন্ধ

২০১৯-১১-২১ ৮:১৭:২৫ এএম

‘রাতারাতি তারকা হইনি’

২০১৯-১১-২১ ৮:১৫:১৪ এএম

পরিবহন ধর্মঘট স্থগিত

২০১৯-১১-২১ ১:০৯:৪৮ এএম

হিটলারের বাড়ি

২০১৯-১১-২১ ১২:১৩:১৩ এএম

৬ জুয়াড়িকে জরিমানা

২০১৯-১১-২০ ১১:৫৮:০৪ পিএম