আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস

আত্মহত্যা এবং জীবনবোধের মনস্তত্ব

প্রকাশ: ২০১৯-০৯-১০ ৮:১৬:৩০ এএম
সাবিহা জাহান | রাইজিংবিডি.কম

|| সাবিহা জাহান ||

বিভিন্ন কারণে পৃথিবীজুড়েই এমনকি আমাদের দেশেও ‘আত্মহত্যা’ বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কিছু তথ্যের উপস্থাপনে এই বিষয়টির তাৎপর্য প্রতিফলিত হবে। পৃথিবীব্যাপী ১৪তম উল্লেখযোগ্য মৃত্যুর কারণ এবং সকল মৃত্যুর মধ্যে ১.৫ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী আত্মহত্যা। বিভিন্ন দেশের গবেষণায় কৈশোরকালীণ আত্মহত্যার চিন্তা করার প্রবণতা বেড়ে যেতে দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরীপ অনুযায়ী প্রায় এক মিলিয়ন মানুষ প্রতি বছর আত্মহত্যার কারণে মারা যায় যা নির্দেশ করে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একটি মৃত্যু!

আরো ধারণা করা হয় যে, উল্লেখিত তথ্য কেবল পানিতে ভেসে থাকা বরফের উপরের অংশ। আরো অনেক তথ্য-উপাত্ত আমাদের অজানাই থেকে যাচ্ছে হয়তো। এ কারণে শুরুতেই বলেছি- বিভিন্ন কারণেই আত্মহত্যার বিষয়টি আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে। আবার আত্মহত্যা নিয়ে যারা কাজ করেন তারা প্রায়শই ধারণা করেন যে, আত্মহত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পরিষ্কারভাবে বোধগম্য নয়। এটা এখনো ধরেই নেয়া হয় যে, আত্মহত্যা এবং আত্মহত্যার চেষ্টা করা বিভিন্ন বিষয়ের সম্মিলিত এবং জটিল ফল যা একে অপরের সঙ্গে জড়িত।

মূল আলোচনা শুরু করার আগে কিছু মৌলিক বিষয়ের উল্লেখ করলে পাঠকের বুঝতে সহজ হতে পারে। আত্মহত্যা বলতে কোনো ব্যক্তির স্বেচ্ছায় নিজের জীবন শেষ করাকে বোঝায়। আর আত্মহত্যামূলক আচরণ বলতে বোঝায় এমন কোনো আচরণ বা চিন্তা যেখানে ব্যক্তি নিজের জীবন শেষ করে দেয়ার কথা চিন্তা করেন। এর মধ্যে বারবার জীবন শেষ করে দেয়ার কথা মনে আসা, কীভাবে নিজের জীবন শেষ করা যায় তা নিয়ে পরিকল্পনা করা ইত্যাদি বোঝায়। আত্মহত্যার চেষ্টা করা বলতে বোঝায়, মরে যাবার উদ্দেশ্য নিয়ে নিজেকে ক্ষতি করার মতো কোনো কাজে লিপ্ত হওয়া। নিজের ক্ষতি করা বলতে আর একটি বিষয় আছে- যার অর্থ যে কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে নিজের ক্ষতি করা বা ক্ষতি করার মতো আচরণ করা। উল্লেখ্য যে, এখানে নিজের জীবন শেষ করে দেয়া বা মরে যাওয়াটা ব্যক্তির উদ্দেশ্য নয়।

আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস-২০১৯ উপলক্ষ্যে আত্মহত্যা নিয়ে লিখতে গিয়ে অনলাইনে কিছু খবরে চোখ বুলাচ্ছিলাম। চোখ আটকে গেল ঢাকা ট্রিবিউনের ২০১৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি খবরে। খবরটির যে অংশে চোখ আটকে গেল তা ছিল সুইসাইড নোট। যিনি নোটটি লিখেছেন তিনি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচেলরস কোয়ার্টার-এ একা থাকতেন এবং ছেলে পড়াশোনার জন্য ঢাকায় থাকত। ঘটনাটি কয়েকবছর আগের হলেও বিভিন্ন কারণে আমার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। যেখানে লেখা ছিল:

‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। শারীরিক, মানসিক চাপের কারণে আমি আত্মহত্যা করলাম। সোয়াদকে যেন ওর বাবা কোনোভাবেই নিজের হেফাজতে নিতে না পারে। যে বাবা নিজের সন্তানের গলায় ছুরি ধরতে পারে, সে যে কোনো সময় সন্তানকে মেরে ফেলতে পারে বা মরতে বাধ্য করতে পারে। আমার মৃতদেহ ঢাকায় না নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেয়ার অনুরোধ করছি।’

কেন যেন মনে হলো, এই নোটটির পিছনে অনেক না-বলা গল্প লুকিয়ে আছে। অসহ্য শারীরিক, মানসিক চাপের একটি গল্প, একজন ছেলে ও একজন মায়ের একটি গল্প, বাবা-ছেলের গল্প, মৃত্যুর একটি গল্প, হয়তো আরো অনেক যা আমি বুঝতে পারছি না। এরকম কিছু ঘটনার পাশাপাশি প্রতি বছর কিছু স্কুল এবং কলেজে ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষায় আশানুরুপ ফল না পেয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যার খবরও আমরা পাই প্রতিনিয়ত। অনেক সময় আবার এমনও শুনতে পাওয়া যায়- প্রেমিক- প্রেমিকা দুজন তাদের সম্পর্কের পরিণতি না পেয়ে সম্মিলিতভাবে আত্মহত্যা করেছে বা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। আর একটি খবরে দেখতে পেলাম, একজন পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর কোনো কারণে নিজের জীবন শেষ করে দিয়েছেন তারই কর্তব্য পালনের পিস্তল দিয়ে এবং পরে জিজ্ঞাসাবাদে তার ৯ বছরের ছেলের কাছে জানা যায়, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে সে বাবাকে দেখেছে পিস্তলটি পরিষ্কার করছেন। আমরা হয়তো জানি না এখানেও হয়তো অনেক গল্প লুকিয়ে আছে। গল্পগুলো ইতিবাচক না নেতিবাচক সে মূল্যায়নে আজ যাবো না, বরং বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে- আত্মহত্যা যারা করেন তাদের গল্পগুলো কেমন হতে পারে যাতে তারা নিজের জীবন শেষ করে দিতে চান।

আত্মহত্যা করা বা আত্মহত্যার চেষ্টা করার পিছনে যে ধরণের বিষয়গুলো সাধারণত ভূমিকা রাখে সেগুলোর মধ্যে যিনি আত্মহত্যা করছেন তার ব্যক্তিত্ব কেমন ছিলো তা নিয়ে প্রায়শই কথা হয়, এমনকি বিভিন্ন গবেষণায়ও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ব্যক্তিত্ব এবং ব্যক্তিভেদে পার্থক্য অনুযায়ী আমরা দেখতে পাই, আত্মহত্যার পিছনে কেমন ব্যক্তিত্বের ধরনকে দায়ী করা হয়। এগুলো যিনি আত্মহত্যা করেন তার ব্যক্তিত্ব অর্থাৎ তিনি কেমন মানুষ সেগুলোকে নির্দেশ করে।

প্রথমেই উল্লেখ করা যায় হতাশাগ্রস্ত কিছু মানুষের কথা। এই ধরনের মানুষ জীবন এবং ভবিষ্যতের প্রতি আশা দেখতে পান না এবং আশাহীন হয়ে পড়েন। বেশ কিছু গবেষণায় আশাহীনতার সঙ্গে আত্মহত্যার সম্পর্ক আছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। আবার অনেক গবেষণায় এমনও পাওয়া গেছে যে, হতাশাগ্রস্থ ব্যক্তি আত্মহত্যার চিন্তা করেন ঠিকই কিন্তু অনেকেই আছেন হতাশ হলেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেন না।

ঝোঁকের বশে কাজ করা বা ইমপালসিভিটি আর এক ধরনের ব্যক্তিত্বের ধরন যার সঙ্গে আত্মহত্যাকে যুক্ত করা হয়। কিছু মানুষ আছেন যারা আবেগের বশে কোনো রকম আগ পিছ চিন্তা না করেই কাজ করেন। অনেক সময়ই যারা পুনঃ পুনঃ আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তাদের মধ্যে এই ব্যক্তিত্বের ধরন দেখতে পাওয়া যায়।

নিঁখুত মনোভাব বা পারফেকশনিজম আর একটি ব্যক্তিত্বের ধরন যারা কোনো কাজ একটা নির্দিষ্ট সীমাকে অতিক্রম না করা পর্যন্ত চেষ্টা করতে থাকেন। অনেকে এর সাথে সামাজিক এবং পারিবারিক প্রত্যাশাকেও যুক্ত করেন যা ব্যক্তির মধ্যে সবসময় কাজ করে এবং সে কোনো কাজ করে সহজে সন্তুষ্টিবোধ করে না। অনেকে আবার নিখুঁত মনোভাবের সাথে ট্রমা এবং নেতিবাচক ঘটনাকেও দায়ী করেন। আবার কিছু মানুষ আছেন যারা কোনো চাপমূলক পরিস্থিতির প্রতি একটু বেশী সংবেদনশীল একইসঙ্গে সমাজ, পরিবার এবং অন্যান্য সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন বা থাকতে চান। বিভিন্ন গবেষণায় এই ধরনের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আত্মহত্যার ঘটনাকে মিলিয়ে দেখেন।

এবার একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাক। কিছু কিছু ব্যক্তিত্বের ধরন আছে যা আত্মহত্যা নয় বরং জীবনবোধের সঙ্গে যুক্ত। আশাবাদী মানুষ যারা তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা কম দেখা যায় বা তারা নিজের জীবন শেষ করে দেয়ার প্ররোচনায় লিপ্ত হন না। তারা ভবিষ্যত চিন্তা করতে পারেন এবং জীবনের জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারেন। আবার কিছু মানুষ আছেন যারা ভিন্নতা এবং বৈচিত্র উপভোগ করতে চান, জীবনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে আত্মহত্যার হার তেমন দেখা যায় না। আবার দেখা যায় যাদের জীবনে বেঁচে থাকার রসদ আছে বলে মনে করেন তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন না। আবার দেখা যায় যারা কোনো সম্পর্কে আছেন, সমাজের সাথে পরিবারের সাথে তার সম্পর্ক ভালো এবং বন্ধন দৃঢ় সে রকম মানুষ আত্মহত্যার কথা কম ভাবেন বলে মনে করা হয়। যারা খেলাধুলা করেন, সমাজসেবামূলক কাজ করেন তাদের মধ্যেও এ প্রবণতা কম দেখা যায়।

একজন মানুষ কেমন হবে সেটা কেবল তার বংশগতি এবং জৈবিক বৈশিষ্ট্যই নির্ধারণ করে দেয় না বরং একটি শিশু যে জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মায় তা প্রতিনিয়ত পরিবার, সমাজ এবং পরিবেশের সাথে মিশে মিশে একটি ধরনে বিকশিত হতে দেখা যায়। এজন্যই আমরা মনোবিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতে চাই- আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব এবং মানুষকে জীবনমূখী করে তোলা সম্ভব। ধরা যাক আমাদের কাছে যখন একজন মানুষ হতাশাগ্রস্থ হয়ে আসেন তখন তিনি কেবল তার জীবনের হতাশার গল্পের দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে আসেন এবং কেবল হতাশার গল্পগুলোই বলতে থাকেন। শুধু বলেনই না তিনি এগুলো মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন এবং সত্যি বলে মনে করতে থাকেন। আমরা তার জীবনের অন্য গল্পগুলোও বের করতে থাকি, সেখানে হয়তো কিছু আশার গল্পও থাকে, কষ্টের গল্পও থাকে। ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন তার জীবনে হতাশার গল্প আছে, কষ্টের গল্প আছে, কিছু আশার গল্পও আছে। তিনি তখন হতাশার গভীর কুয়া থেকে অন্যদিকেও চোখ মেলতে থাকেন। এতেই যে আমরা থেমে যাই তা না, চাপ মোকাবিলা করা, বিষণ্নতা কমানো, সামাজিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং আরো অনেক পদ্ধতি তাকে তার জীবনের গল্পগুলো বের করতে এবং গল্পগুলোকে আরো বড় করতে সাহায্য করে। আমরা শুরুতেই দেখেছি আত্মহত্যার ব্যাখ্যা খুব সহজ কোনো বিষয় না। আবার অনেক বিষয় একসঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ করে। ঠিক তেমনই কেবল চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীর কাছে গেলেই যে তিনি আত্মহত্যার ফাঁদ থেকে বের হয়ে আসতে পারবেন তাও না। পরিবারের সমর্থন, বন্ধুবান্ধব বা সহপাঠীদের সহযোগিতা এমন অনেক বিষয়ই সাহায্য করতে পারে একজন মানুষকে জীবনমূখী করে তুলতে।

লেখার শুরুতে একজনের আত্মহত্যার বিষয়টি তুলে ধরেছিলাম তার রেখে যাওয়া সুইসাইড নোটসহ। কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিতে চাই পাঠকের কাছে। প্রশ্নগুলো একবারেই আমার মনগড়া কিছু প্রকল্প। কেবল ভিন্নভাবে ভাবার উদ্দেশ্যেই তুলে ধরা হলো। প্রশ্নের উত্তরের প্রতি কোনো আশা রাখছি না বরং সুযোগ খুঁজে নিবো উত্তর দেয়ার-

১. শারীরিক এবং মানসিক চাপ মোকাবেলা করার জন্য যদি তিনি কারো সাথে কাউন্সেলিং এবং সাইকোথেরাপীতে বসতেন অথবা কোনো প্রশিক্ষণ তিনি পেতেন তাহলে কি এই ঘটনা প্রতিরোধ করা যেত?

২. পরিবারের সঙ্গে, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে তিনি কেমন মানুষ ছিলেন?

৩. ছেলে অন্য জায়গায় না থেকে যদি তার সঙ্গেই থাকতেন তাহলেও কি এমনটা ঘটতো?

৪. তাদের স্বামী-স্ত্রী বর্তমান, গল্পটি কি ভিন্নরকম হওয়ার কোনো সুযোগ ছিলো?

লেখক: ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯/তারা


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

৪ বছর পর বিয়ের খবর দিলেন মম

২০১৯-১১-২০ ৩:৫৯:৩৭ পিএম

হাসপাতালে পরিচালক সি. বি. জামান

২০১৯-১১-২০ ৩:৪৫:২৯ পিএম

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এক

২০১৯-১১-২০ ৩:১৬:২৮ পিএম

ঢাকায় গণপরিবহন সংকট, ভোগান্তি

২০১৯-১১-২০ ৩:১৬:২৩ পিএম

কৃতির পরিবর্তে অঙ্কিতা

২০১৯-১১-২০ ৩:১০:০৮ পিএম