বাংলা নাটকের পরিণতি যেন বাংলা সিনেমার মতো না হয়

প্রকাশ: ২০১৯-০৯-২৬ ৩:৪৮:২১ পিএম
মো. সাখাওয়াত হোসেন | রাইজিংবিডি.কম

বাংলাদেশের সংস্কৃতি, সভ্যতা সুপ্রাচীন। সম্পদ ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতির কারণে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী বাংলাকে তাদের করালগ্রাসে রাখতে চেয়েছে। কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, বাঙালিয়ানা বাঙালি জাতিকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে, দিয়েছে স্বাতন্ত্র্য অবস্থান। অর্থাৎ বলতে গেলে সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক হিসেবে বাঙালি জাতি সর্বদাই পরিপূর্ণ। ফলে মননের বিকাশ ও বিবেক বোধ জাগ্রত করতে ভিন দেশের সংস্কৃতির উপর আশ্রয় নেয়ার আমাদের প্রয়োজন নেই। কিন্তু সমসাময়িক কালে যে বিষয়টি আমাদের পীড়া দেয় তা হচ্ছে- আমরা কেন জানি আমাদের সৃষ্টি, সংস্কৃতি ভুলে যাচ্ছি; ভুলে যাচ্ছি আমাদের অর্জিত মর্যাদার কথা। যে কারণে বিজাতীয় সংস্কৃতির করাল গ্রাসে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রচলিত রীতিনীতি। এসবের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান ও সমাধান ব্যতীত বাংলার অপরূপ রূপ প্রকৃতি ও সংস্কৃতির বিকাশ সম্ভব হবে না।

কিছুদিন আগের একটা ঘটনা শেয়ার করি- খবরের পাতায় দেখেছি একজন প্রযোজক সিনেমায় লগ্নিকৃত টাকার সামান্যই ঘরে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি ভবিষ্যতে বাংলা সিনেমা প্রযোজনা করবেন না মর্মে ঘোষণা দিয়েছেন। এর মাধ্যমেই প্রকৃত অর্থে বাংলা সিনেমার ভবিষ্যত ও বর্তমান চিত্র ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ বাংলা সিনেমার দর্শক ও বাজারের অবস্থান নিম্নগামী। যদিও এখনো বছরে বেশ কিছু সিনেমা নির্মিত হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে বর্তমানে নির্মিত সিনেমাগুলোর বেশ কিছু টিভিতে ও অনলাইনে প্রিমিয়ার হয় এবং কিছু সিনেমা বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিদেশে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। তৎসাপেক্ষে সিনেমা শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই সিনেমাবিমুখ হয়ে বিভিন্ন পেশায় নিজেদের সংযুক্ত করছেন। সিনেমার গল্পের সংকট, অশ্লীলতা, সিনেমা হলের নোংরা পরিবেশ, ভাল মানের অভিনেতা-অভিনেত্রী সংকট, পেশাদার প্রযোজক ও পরিচালকের অভাব, নকল গল্পের সংযোজন, পাইরেসি, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সহযোগিতার অভাব ইত্যাদি কারণগুলোকে মোটা দাগে চিহ্নিত করা যায় বাংলাদেশে সিনেমা শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য।

অশ্লীল অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দাপটে একটা সময়ে সিনেমা শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে রাজত্ব করা শিল্পীদের চাহিদা কমে যাওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতিতে চলচ্চিত্রে তেমন জনপ্রিয় শিল্পীদের আর দেখা যায় না। তবে এ ক্ষেত্রে দর্শকের দায়ও কিন্তু কম নয়। কেননা একটা পরিস্থিতিতে অশ্লীল সিনেমার জয়জয়কার ছিল। সিনেমার জয়জয়কার তখনই হয় যখন ঐ সিনেমার দর্শক সংখ্যা খুব বেশি থাকে। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এবং সময়ের চাহিদা বিবেচনায় ঐ দর্শক শ্রেণির সংখ্যাও যেমন কমে আসছে তেমনি বন্ধ হয়ে গেছে অশ্লীল সিনেমার নির্মাণ কাজ। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, অশ্লীলতা সাময়িক স্থায়ী হয় কিন্তু মানসম্পন্ন সিনেমার চাহিদা চিরকাল থাকে। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এমন বহুসংখ্যক জনপ্রিয় সিনেমা রয়েছে যেগুলোর বর্ণনা এখনো সিনিয়রদের কাছে শোনা যায়। চাইলে পাঠক সেগুলো ইউটিউবের কল্যাণে আবার দেখতে পারেন। পুরনো দিনের বাংলা সিনেমার গান এখনো মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। কিন্তু বর্তমানে তৈরিকৃত গানগুলোর ছন্দ, সুর, তাল, লয়ের ভিন্নতা থাকায় দর্শক মনে তেমন আলোড়ন তুলতে পারে না।

পরিবারের সকল সদস্য একত্রে বসে বাংলা সিনেমা দেখার আয়োজন বহু আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে। দর্শক যখন সিনেমা সংকটের কারণে পারিবারিক বিনোদনের জন্য বাংলা নাটকের উপর নির্ভর করা শুরু করেছে; সেটি কিন্তু বেশ কিছুদিন ইতিবাচক ধারায় প্রবাহমান ছিল। হলফ করে বলতে পারি, বাংলাদেশী দর্শক টেলিভিশনে প্রচারিত অনুষ্ঠানের মধ্যে পারিবারিক বিনোদন হিসেবে বাংলা নাটকের উপরেই নির্ভর করে। যদিও বিদেশী সিরিয়ালও বিনোদনের ক্ষেত্রে একটি বিশাল প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। আমি যদি বাংলাদেশী বিনোদন হিসেবে কোন একটি বিষয়কে সামনে নিয়ে আসতে চাই তাহলে নির্ধিদ্বায় বলা যায়, বাংলা নাটক দর্শকদের বিনোদন মেটাতে সক্ষম হয়েছে। কেননা, বাংলা নাটকের নির্মাণশৈলী, গল্প, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের চমৎকার অভিনয় এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা দর্শকদের বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশী নাটকের একজন ভক্ত হিসেবে অত্যন্ত বেদনাচিত্তে বলতে হচ্ছে, বাংলাদেশের নাটকে বিজাতীয় সংস্কৃতির বিচরণ লক্ষ্য করছি। আপনারা নিশ্চয়ই দেখে থাকবেন সাম্প্রতিক সময়ে টেলিভিশনসহ অনলাইন মিডিয়ায় প্রচারিত বেশ কিছু নাটকে ব্যবহৃত সংলাপ, ড্রেসআপ, নাটকের কাহিনী- সর্বোপরী নাটক নির্মাণ প্রত্যেকটা জায়গায় যে করুণ পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে তাতে বলা যায় খুব বেশি দিন লাগবে না যেদিন বাংলা সিনেমার মতো বাংলা নাটকের দর্শক সংখ্যা শূন্যের কোটায় চলে আসবে। উদ্ভট ড্রেসআপ, অশ্লীল শারীরিক অঙ্গভঙ্গি ও রুচিহীন সংলাপময় নাটক কখনোই পরিবারের সকল সদস্য একত্রে বসে দেখা যায় না। তবে এটাও সত্য, সব নাটকেই এমন হচ্ছে তা বলা যাবে না। এখনো ভালো নাটক নির্মাণ হচ্ছে। তবে যে সব নাটকে বিজাতীয় সংস্কৃতি ও রুচির সংযোজন ঘটানো হচ্ছে সে সব নাটকের সাথে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তড়িৎ গতিতে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। নতুবা বাংলা নাটকের পরিণতি বাংলা সিনেমার মতো হতে খুব বেশি দিন সময় লাগবে না।

একটা কথা সকলের মনে রাখা প্রয়োজন- আমাদের সংস্কৃতিকে আমাদেরই ধারণ করতে হবে। না হলে স্বজাতির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। সকল ধরনের বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। সংস্কৃতি চর্চার পথ উন্মুক্ত করতে হবে। পথনাটক, মঞ্চনাটক, কবিতা আবৃত্তি, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, জারিগান, সারিগান, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, নৌকা বাইচ, ঘোড়দৌড় সহ অঞ্চলভেদে হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতির উপাদানগুলো পুনরুদ্ধার ও জাগরুক করার প্রশ্নে সকল সচেতন মানুষকে একত্রিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে কাজ করে যেতে হবে। যদি আমাদের সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো সচল ও অনুশীলন করতে পারি তাহলে সমাজ থেকে নানা অনাচার, অবিচার, অন্ধকার, নৈরাজ্য, গুজব দূর হওয়ার পাশাপাশি আলোকিত সমাজ বিনির্মাণ সম্ভবপর হবে। উল্লেখ্য যে, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশে সংস্কৃতি ও সভ্যতা সম্পর্কিত একাডেমিক ডিসকোর্স চালু করা প্রয়োজন। যেখান থেকে বর্তমান প্রজন্ম দেশীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে মেধা, মনন ও মানসে দেশপ্রেমের মৌলিক সুকুমারবৃত্তি বপন করতে পারে। আর এজন্য সরকারের সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব নিতে হবে। আশা রাখবো বাংলাদেশ সরকার বাঙালি জাতির সংস্কৃতিতে বহমান ও বিদ্যমান উপাদানগুলোকে যথাযথ মূল্যায়ন করবে এবং যেগুলো হারিয়ে গেছে সেগুলো পুনরুদ্ধারে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পাশাপাশি বাংলার সংস্কৃতির উপাদানগুলোর চর্চা ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা জাতীয়ভাবে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

লেখক: প্রভাষক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


ঢাকা/তারা


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

ইউপি সদস্যসহ তিনজনের কারাদণ্ড

২০১৯-১০-১৭ ৭:৩৯:০৩ পিএম