ক্যাসিনো ইস্যু যেন ধামাচাপা দেয়া না হয়

প্রকাশ: ২০১৯-০৯-২৯ ১:৫৯:২০ পিএম
নজরুল মৃধা | রাইজিংবিডি.কম

সম্ভবত দেশে এখন সবচেয়ে বেশিবার উচ্চারিত শব্দ ‘ক্যাসিনো’। ক্যাসিনো-কাণ্ডে হাতে গোনা যে দু’চারজন আটক হয়েছেন তার চেয়ে শতগুণ বেশি হয়েছে আলোচনা, সমালোচনা। সংবাদপত্রের সূত্রমতে এখন পর্যন্ত যারা আটক হয়েছেন তাদের সংখ্যা ১০-১৫ এর বেশি হবে না। অথচ এ নিয়ে কত হইচই! এই ক্যাসিনো বাণিজ্যও রয়ে যেত দৃষ্টির অন্তরালে যদি না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে কঠোর না হতেন। এখান প্রশ্ন হচ্ছে- হাতে গোনা দু’চারজনকে ধরে জুয়ার এই রমরমা ব্যবসা বন্ধ করা যাবে কি? এর শেকড় পর্যন্ত কি যেতে পারবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী?

অনেকেই ভাবছেন, অন্তত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে, অতীতের অনেক ইস্যুর মতো ক্যাসিনো ইস্যুও খুব দ্রুত চাপা পড়ে যাবে। তবে স্বল্প সময় কিংবা স্বল্পসংখ্যক মানুষকে আটক করে জুয়া বন্ধে যে মহতী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এজন্য দেশবাসীর ধন্যবাদ পেতে পারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারপরও কথা রয়ে যায়, তা হলো পর্দার অন্তরালের অভিনেতাদের কথা। তারা অন্যান্য ঘটনার মতো এই ইস্যুটিতেও পর্দার আড়ালে থেকে যাবেন না তো?

পাঠক চলুন, এবার ক্যাসিনোর উৎপত্তি সম্পর্কে কিছু ধারণা নেয়ার চেষ্টা করি। ক্যাসিনো শব্দের মূল অর্থ ঘর। শব্দটি ইতালিয়। এর অর্থাৎ ছোট ভিলা, গ্রীষ্মকালীণ ঘর কিংবা সামাজিক ক্লাব। তবে ১৯ শতকের দিকে ক্যাসিনো বলতে এমন ভবনকে বোঝানো হতো যা আনন্দ-বিনোদনের নিরাপদ স্থল বলে বিবেচিত। যেমন  নাচ, গান, জুয়া ও ক্রীড়া ইত্যাদি। আধুনিক এই সময়ে ইতালিতে আরেক ধাপ এগিয়ে ক্যাসিনোকে ব্যবহার করা হচ্ছে জুয়ার পাশাপাশি পতিতালয় হিসেবে। তবে সব ক্যাসিনোতে  কিন্তু জুয়া খেলা হয় না। ক্যালিফোর্নিয়ার শান্তা কাতালিনা দ্বীপের কাতালিনা ক্যাসিনোতে কখনো জুয়া খেলা হয়নি। এটি যখন নির্মাণ করা হয় তখন ক্যালিফোর্নিয়ায় জুয়া নিষিদ্ধ ছিল। তেমনি কোপেনহেগেন ক্যাসিনো থিয়েটার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৮৪৮ সালে আন্দোলনের সময় গণজমায়েতের কারণে এই ক্যাসিনো পরিচিতি লাভ করে। এই আন্দোলন ডেনমার্ককে একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে পরিণত করে। ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত ডেনিশ থিয়েটার নামে সুপরিচিত ছিল ক্যাসিনোটি। ফিনল্যান্ডের হাংকো ক্যাসিনোতেও কখনো জুয়া খেলা হয়নি । জার্মান এবং স্প্যানিশ ভাষায় ক্যাসিনোকে বলে অফিসার মেস। জুয়ার উৎসটা পরিষ্কার না হলেও ১৬৩৮ সালে ক্যাসিনো ইউরোপের ভেনিসে শুরু হয়। তবে ১৭৭৪ সালে এটি বন্ধ করে দেয়া হয়। আমেরিকায় স্যালুন নামে প্রথম জুয়ার বাড়ি অর্থাৎ ক্যাসিনো চালু হয়।  আমেরিকার শহর নিউ অরেলিন্স, সেন্ট লুইস, শিকাগো এবং সানফ্রান্সিসকোয় জুয়ার জন্য স্যালুন নির্মিত হয়। এসব স্যালুনে যারা আসতেন তারা পান করতেন, আড্ডা দিতেন এবং জুয়া খেলতেন।

১৯৩১ সালে নেভাদায় জুয়া খেলা বৈধ করা হলে সেখানে প্রথম বৈধ আমেরিকান ক্যাসিনো নির্মিত হয়। ১৯৭৬ সালে নিউ জার্সি আটলান্টিক শহরে জুয়া খেলার অনুমোদন দেয়া হয়। এটা বর্তমানে আমেরিকার বৃহৎ জুয়ার শহর। জার্মানিতে নির্দিষ্ট লাইসেন্সের অধীনে মেশিনভিত্তিক জুয়া খেলার ক্যাসিনো, রেস্তোরাঁ, বার চালানোর অনুমতি দেয়া হয়েছে। গ্রাহক ক্যাসিনোতে গিয়ে ইলেক্ট্রনিকস গেমস দ্বারা জুয়া খেলায় অংশগ্রহণ করে। এক্ষেত্রে অবশ্যই অভিজ্ঞতা বা দক্ষতার প্রযোজন হয়। কারণ অধিকাংশ গেমস গাণিতিকভাবে বিন্যাস করা থাকে। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে সব সমাজেই কোন না কোনভাবে  জুয়ার প্রচলন ছিলো। প্রাচীন গ্রীক-রোমান থেকে নেপোলিয়নের ফ্রান্স থেকে বর্তমান বাংলাদেশে আসন গেড়েছে ক্যাসিনো-আড্ডা। অনেকের মতে ৮০ দশকের পরপরই বাংলাদেশে ক্যাসিনোর যাত্রা শুরু। তবে এর ব্যাপকতা কত বড় তা প্রকাশ পেয়েছে সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে জুয়া খেলা বহু পুরনো এবং প্রচলিত একপ্রকার অবসর-বিনোদনের মাধ্যম। তবে জুয়া খেলতে খেলতে অনেক মানুষ জীবনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। জুয়ায় হেরে গিয়ে জীবনটাকে সমস্যাবহুল করে তোলেন তারা। যারা জুয়ায় আসক্ত তারা জীবনযাত্রার অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ দিয়ে জুয়ার মাধ্যমে আর্থিক উন্নতির পথ খোঁজেন। নিয়মিত জুয়ারুরা শেষ পর্যন্ত টাকা পয়সা হারিয়ে সামাজিক ও পারিবারিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েও এই নেশা থেকে বের হতে পারেন না। ফলে পারিবারিক ও সামাজিক অশান্তি লেগেই থাকে। অনেকের কাছে এটি মাদকের চেয়েও বড় নেশা। প্রথম দিকে মানুষ নিজের আনন্দের জন্য জুয়া খেলত। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যেও জুয়ার নেশা মানসিক রোগে পরিণত হয়। জুয়ার নেশার মতো মনের অসুখকে প্রথম প্রথম মানুষের হঠকারী মনোভাব বা আচরণ বলে মনে করা হতো। কিন্তু এখন এটি মাদকাসক্তির মতোই এক প্রকার আসক্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

জুয়া বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ প্রশংসিত হলেও কেউ কেউ আমাদের দেশে ক্যাসিনোর উৎপত্তি সম্পর্কে একে অন্যকে দোষারোপ করছেন। তারা ভুলে যাচ্ছেন- যার মাধ্যমেই ক্যাসিনো অপসংস্কৃতি এদেশে গড়ে উঠুক না কেন এর দায় কেউ এড়াতে পারেন না। ইতোমধ্যেই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন- রাজধানীতে এগুলো চলছে দিনে পর দিন, প্রশাসন জানে না! এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। জুয়ার মাধ্যমে অনেকেই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। এটা একার পক্ষে সম্ভব নয়।  কারণ এই অবৈধ কাজকে দিনের পর দিন অলিখিত বৈধতা যারা দিয়েছেন তাদের নাম এখনো মিডিয়ায় আসেনি। তাই প্রশ্ন উঠেছে- হাতে গোনা ১০-১৫ জনকে আটক করে বিচারের আওতায় আনলেও প্রকৃত সমস্যার সমাধান হবে না।  যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই জুয়া খেলায় সহযোগিতা করে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন তাদেরকেও পর্দার অন্তরাল থেকে টেনে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

অনেক আগে একটি ইরানি ছায়াছবি দেখেছিলাম। ছবিটির সারমর্ম ছিল- এক  পুলিশ কর্মকর্তার সন্তান মাদক ও জুয়ায় আসক্ত হওয়ায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। এক সময় তিনি মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে অভিযানে নামেন। তিনি দেখতে পান মাদক জুয়ার টাকার ভাগ রাষ্টযন্ত্রের সর্বনিন্ম ব্যক্তি থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিটিও পাচ্ছেন। এতে তিনি আরো হতাশ হয়ে পড়েন। তার মাদক ও জুয়াবিরোধী অভিযান ব্যর্থতায় পরিণত হয়। সিনেমার মতো আমাদের এই অভিযান যেন ব্যর্থ না হয়। প্রচার মাধ্যমগুলোর কাজ এখনও বাকি। আমি মনে করি, তাদের আরো সক্রীয় হতে হবে। এখনও এর পেছনের মানুষগুলোর নাম আমরা জানি না। কোন নেতা, কোন বড় ভাই, কোন পাতি নেতা, সরকারি কোন কর্মকর্তা  প্রতি মাসে কোন ক্যাসিনো থেকে কত টাকা পেতেন তার তালিকা বের করুন। প্রচার মাধ্যমে এগুলো তুলে ধরুন। কাউকে না কাউকে দায়িত্ব নিয়ে পর্দার পিছনের মানুষগুলোকে লোকচক্ষুর সামনে আনতেই হবে।

লেখক: সাংবাদিক


ঢাকা/তারা


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

ইউপি সদস্যসহ তিনজনের কারাদণ্ড

২০১৯-১০-১৭ ৭:৩৯:০৩ পিএম