যে রুদ্ধশ্বাস সময় পার হয়ে এসেছি

প্রকাশ: ২০২০-০৩-১৬ ১২:৩৭:৩৬ এএম
মিনার মনসুর | রাইজিংবিডি.কম

বর্তমান প্রজন্ম হয়ত কল্পনাও করতে পারবে না যে কত বাধার বিন্ধ্যাচল পার হয়ে, প্রতীক্ষার কত দীর্ঘ রক্তাক্ত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে, জাতি হিসেবে আমরা আজ সাড়ম্বরে উদযাপন করতে যাচ্ছি প্রিয় নেতার জন্মশতবার্ষিকী। রাষ্ট্র অবনত চিত্তে শ্রদ্ধানিবেদন করবে তার প্রতিষ্ঠাতার প্রতি। দেশ-বিদেশের বাঙালি-অধ্যুষিত প্রতিটি প্রান্ত ছুঁয়ে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হবে পিতা ও নেতার বজ্রকণ্ঠ বাণী। জনতার হৃদয় উজাড় করা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ভিন্নতর মাত্রায় স্পর্শাতীত এক উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হবেন তিনি। অথচ যে রুদ্ধশ্বাস সময় পার হয়ে এসেছি তা ভাবলে আমরা এখনো শিহরিত হই।

বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে সর্বস্তরের মানুষের এই যে আবেগ-উচ্ছ্বাস তার সবটাই স্বার্থগন্ধবর্জিত এমন বলা যাবে না। বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়। ফলে জনগণের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আবেগের সঙ্গে স্বার্থগন্ধী কিছু কিছু আতিশয্যও হয়তো যুক্ত হচ্ছে। ভারী হচ্ছে অতিভক্ত ও স্তাবকের কাফেলা। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায়ও তাই হয়েছে। কিন্তু সপরিবারে তিনি নিহত হওয়ার পরের দৃশ্যপট ছিল একেবারেই অন্যরকম। ঘটনার আকস্মিকতায় সাধারণ মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল- এটি সত্য। তবে সর্বক্ষণ যারা তাঁকে ঘিরে থাকতেন, স্তাবকতার মধু বর্ষণ করতেন তাঁর কানে- তাদের অনেকের বেলায় এ কথা খাটে না। চরম দুঃসময়ে তারা শুধু মুখ ফিরিয়ে নিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং সপরিবারে মর্মান্তিকভাবে নিহত এই মহান নেতার বিরুদ্ধে বিরামহীন বিষোদ্‌গারের পাশাপাশি জঘন্য অপপ্রচারেও অবতীর্ণ হয়েছিলেন প্রকাশ্যে। এটাই নিয়ম। সুসময় যেমন ভক্ত-সমর্থকের বাঁধভাঙা ঢল নিয়ে আসে, তেমনি দুঃসময়ও একা আসে না। শঠতা ও বিশ্বাসঘাতকতার বিশাল ডালা ভরে নিয়ে আসে খা খা শূন্যতা।

বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তীকালের অভিজ্ঞতা আরও বিভীষিকাময়। একদিকে ক্ষমতা জবরদখলকারী সেনাশাসকের রক্তচক্ষু, অন্যদিকে ঘাতকের সদম্ভ উল্লাস। মনুষ্যরক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘের মতো তারা তখন ঘুরে বেড়াচ্ছে জনপদে। নারী ও শিশুসহ অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের রক্তে স্নাত তাদের হাত। বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করেও নিরস্ত হয়নি হিংস্র এ ঘাতকের দল, বাংলার মাটি থেকে তাঁর অস্তিত্ব মুছে ফেলার ভয়ঙ্কর খেলায়ও মেতে ওঠেছিল তারা। বঙ্গবন্ধু যেন নিষিদ্ধ এক নাম! তাঁর নাম উচ্চারিত হওয়া মাত্রই ছুটে আসে রক্তলোলুপ হায়েনার পাল। এমন এক চরম বৈরী পরিবেশে- বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের একমাস পরেই শুরু হয় আমার কলেজ জীবন। তার ভয়াল ছায়া বিস্তৃত হয়েছিল আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও। নিষেধের রক্তচোখ সর্বক্ষণ আমাদের তাড়া করছিল। ভীতি আর আতঙ্ক ছিল আমাদের নিত্যসঙ্গী। মহান মুক্তিযুদ্ধের আগুনে পুড়ে আমাদের চেতনা সোনায় পরিণত হলেও রাজনীতির সঙ্গে আমি সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলাম না। ঝোঁক ছিল সাহিত্যের দিকে। পড়তাম রুশবিপ্লবের দুনিয়াকাঁপানো সব বই। যৎসামান্য লেখালেখিও করতাম। সেই সূত্রে সারা দেশের লিটল ম্যাগাজিন কর্মীদের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল আমার। যুক্ত ছিলাম সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। হৃদয় ছিল সব ধরনের কলুষ ও কূপমণ্ডুকতা থেকে মুক্ত আর চেতনা ছিল তরবারির মতোই শানিত। ফলে স্বঘোষিত ঘাতকদের এই বর্বরতা এই ঔদ্ধত্য এই রক্তচোখ কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না আমরা। 
মানবেতিহাসের ঘৃণ্যতম এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কিছু একটা করার জন্যে আমরা তখন টগবগ করে ফুটছিলাম। রাষ্ট্র তখন ঘাতকদের দখলে। সময়ের দাবি ছিল ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মতো অস্ত্র হাতে নেওয়ার। কিন্তু বাস্তবতা ছিল একেবারেই অন্যরকম। ফলে এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন কিছু কথাবার্তা হলেও কী করবো কীভাবে করবো তার কোনো কুলকিনারা পাচ্ছিলাম না আমরা। এ সময়ে অভিনব এক আইডিয়া নিয়ে এগিয়ে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া আমাদের এক বড়োভাই। তাঁর নাম খোরশেদ আলম সুজন। তিনি এখন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। মূলত তাঁরই উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম বার্ষিকীতে (১৯৭৬ সালের ১৫ আগস্ট) প্রকাশিত হয় ভূপেন হাজারিকার বিখ্যাত একটি গানের পঙ্‌ক্তি-সংবলিত একপৃষ্ঠার একটি প্রচারপত্র। সেই পঙ্‌ক্তিগুলো হলো-‘বলো কী তোমার ক্ষতি/জীবনের অথৈ নদী/পার হয় তোমাকে ধরে/দুর্বল মানুষ যদি।’ প্রচারপত্রের অর্ধেকটা জুড়ে ছিল কাঠের ব্লকে মুদ্রিত বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ একটি ছবি। তার নিচে ৩৬ পয়েন্ট টাইপে পঙ্‌ক্তিগুলো ছাপা হয়েছিল। গোপনে বিলিকৃত এ প্রচারপত্রটি বেশ সাড়া জাগিয়েছিল।

এখানে আরও এক অকুতোভয় তরুণের কথা না বললে মহা অন্যায় হবে। তিনি হলেন অকালপ্রয়াত ছাত্রনেতা বশির উদ্দিন মাহমুদ। তাদের গোটা পরিবারটিই ছিল বঙ্গবন্ধুঅন্তপ্রাণ। সক্রিয়ভাবে ছাত্রলীগ করতেন। পাশাপাশি চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় ‘কর্ণফুলী’ নামে একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। মূলত তাঁর হাত ধরেই আমি ও দিলওয়ার এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হই সম্ভবত চুয়াত্তর সালের শেষের দিকে। এখানে খোরশেদ আলম সুজনসহ চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেকেরই নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল। এখন ভাবতেও শিহরিত হচ্ছি যে, এ সংগঠনের ‘কাভারে’ বশির উদ্দিন মাহমুদ দুটি দুঃসাহসী কাজ করেছিলেন পঁচাত্তরপরবর্তীকালে। প্রথম কাজটি ছিল ১৯৭৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম শহিদ মিনারে বঙ্গবন্ধুহত্যার প্রতিবাদে শ্লোগান দেওয়া। যতদূর মনে আছে, তিনি আমাদের টেরিবাজারের একটি গলিতে ফুলসহ সমবেত হতে বলেছিলেন খুব ভোরে। সেখানে সব মিলিয়ে আমরা ৫/৭ জন জড়ো হয়েছিলাম। তখন একুশের ভোরে খালি পায়ে প্রভাতফেরি হতো শহরজুড়ে। প্রভাতফেরির মিছিলে মিশে গিয়ে আমরা শহিদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করি। তার পরই আচমকা বক্তৃতা দিতে শুরু করেন সুজন ভাই। শহিদ মিনারে তখন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের ভিড়। চারপাশে সেনা ও পুলিশ প্রহরা। মুহূর্তে একটা হৈ চৈ শুরু হয়ে যায়। তার মধ্যেই বশির ভাই শ্লোগান দিতে থাকেন: ‘বঙ্গবন্ধুর রক্ত/বৃথা যেতে দেব না।’ ভূপেন হাজারিকার বাণী-সংবলিত প্রচারপত্রটিও বশির ভাইয়ের মাধ্যমেই আমাদের হাতে এসেছিল এবং রাতের অন্ধকারে আমরা তা বিলি করেছিলাম। বিষয়টি জানাজানি হলে তাকে প্রায় নিঃশব্দে ‘কর্ণফুলী’ ছেড়ে আসতে হয়েছিল।

১৯৭৬ সালের ১৫ আগস্টে আমরা আরও একটি দুঃসাহসী কাজ করে বসি। সেটি হলো, বাঙালির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এ নেতার প্রথম শাহাদাৎ বার্ষিকী উপলক্ষে আমরা কাঙালি ভোজ, কোরানখানি ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করি চট্টগ্রামের পশ্চিম বাকলিয়ায়। একমাত্র যে গরুটি জবাই হয়েছিল সেটি কিনে দিয়েছিলেন সরকারি একটি ব্যাংকের নিম্নপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা। তাঁর নাম জয়নাল আবেদিন। চালের জোগান দিয়েছিলেন চাক্তাইয়ের একজন ব্যবসায়ী। তাঁর নাম আবদুল গাফ্‌ফার  খান-সম্পর্কে তিনি আমার ভগ্নিপতি। শেষোক্ত জন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন বহু বছর আগে। প্রথম জনের খবর জানি না। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে জানি, বঙ্গবন্ধুর প্রতি নিবেদিত এই দুটি মানুষ কখনোই কোনো প্রতিদান চাননি। কাঙালিভোজের সমস্ত আয়োজন যখন শেষ পর্যায়ে; তখনই সেনা ও পুলিশ সদস্যরা সমগ্র এলাকাটি ঘিরে ফেলে। আটক করে আমাদের বালক দলটিকে। তাদের একটিই জিজ্ঞাসা: ‘নেতা কে?’ উদ্যোক্তাদের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে বড় ছিলাম আমি, আমার সহপাঠী শাহরিয়ার খালেদ ও আমার বড়ভাই রাশেদ মনোয়ার। সেও তখন কলেজের উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বাদবাকি সবাই ছিল স্কুলের শিক্ষার্থী। তার মধ্যে অসম সাহসী একজনের কথা মনে পড়ছে। তার নাম জামশেদুল হায়দার লিটন। সে তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। অগত্যা আমিই এগিয়ে যাই সামনে। বলি, ‘আমিই নেতা’। তরুণ সেনা কর্মকর্তাটি সঙ্গত কারণেই আমার কথা বিশ্বাস করেননি। কয়েক দফা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ওয়াকিটকিতে আলাপের পর তিনি কাঙালি ভোজ ও দোয়া মাহফিল বন্ধের নির্দেশ দেন। মুহূর্তে তছনছ করে দেওয়া হয় আমাদের সব আয়োজন।

কয়েক মাসের ব্যবধানে আমাদের হাতে আসে কবি নির্মলেন্দু গুণের সেই অসামান্য কবিতাটি- ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’। বাংলা একাডেমির এক অনুষ্ঠানে স্বকণ্ঠে কবিতাটি পাঠ করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। সেই কবিতা তখন আমাদের ভেতরে যে কী বিপুল অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল তা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। তাৎক্ষণিকভাবে কবিতাটির শত শত কপি গোপনে মুদ্রিত করে আমরা জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেই। বঙ্গবন্ধুর ছবি-সংবলিত ভূপেন হাজারিকার গানের সেই বাণী এবং নির্মলেন্দু গুণের এই কবিতা শুধু যে আমাকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল তা-ই নয়, হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো আমরা প্রতিবাদের সর্বোত্তম পথটিও পেয়ে যাই। সেই শুরু।

‘বঙ্গবন্ধুর তৃতীয় শাহাদাৎ বার্ষিকী স্মরণিকা’ হিসেবে ১৯৭৮ সালের ১৫ আগস্ট আমরা প্রথম প্রকাশ করি ‘এপিটাফ’। এ নামকরণের মূলেও ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষাদময় পটভূমি। ডিমাই ১/৮ সাইজের ৪০ পৃষ্ঠার এ সংকলনে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ৪টি প্রবন্ধ, একটি সম্পাদকীয় (পুনর্মুদ্রিত) এবং ১২টি কবিতা ছাপা হয়। প্রচ্ছদে তুলে ধরা হয় বঙ্গবন্ধুর স্মরণীয় কিছু বাণী। এটি প্রকাশ করতে গিয়েও অভাবনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় আমাদের। পত্রিকাটির কাজ হচ্ছিল ফরহাদ বেগের কাকলি প্রেসে। হঠাৎ সেখানে হানা দেয় পুলিশ। চলে তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ। মালিক (নামটি এখন আর মনে করতে পারছি না) বেঁকে বসেন। বন্ধ হয়ে যায় পত্রিকার কাজ। আমাদের হতাশা যখন চরমে, তখনই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাহ আল হারুণ। বনেদী পরিবারের সন্তান হারুণ ভাই (বর্তমান বিএনপি নেতা সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের বড় ভাই) তখন চট্টগ্রামের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকারও সম্পাদক। সেই দুঃসময়েও হাতে গোনা যে কজন আওয়ামী লীগ নেতা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুভক্ত নেতাকর্মীদের জন্যে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন নিজের বাসগৃহের দরোজা হারুণ ভাই তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তিনিই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত একটি প্রেসে ‘এপিটাফ’ মুদ্রণের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কালিঝুলিময় প্রায় অন্ধকার ভৌতিক সেই প্রেসে বাইরে তালা দিয়ে রাতে আমরা কাজ করতাম লুঙ্গি পরে মাথায় টুপি দিয়ে। তখনই আমরা খবর পাই যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রচারপত্র প্রকাশ করার কারণে সেনা গোয়েন্দারা তুলে নিয়ে গেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের এক ছাত্রসহ দুই তরুণকে। তাদের মধ্যে একজন প্রাণে বেঁচে গেলেও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন সেনা নির্যাতনে।

‘এপিটাফ’ আমাদের সাহস বাড়িয়ে দেয়। পরের বছরই আমরা প্রকাশ করি ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রতিবাদী কবিতা ও ছড়া সংকলন ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’ প্রকাশিত হয়ে গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। স্বল্প পরিসরের লিটলম্যাগধর্মী এ-প্রকাশনাটি তখন বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। প্রতিবাদী তরুণ লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের উদ্যোগে প্রায় একই সময়ে আরও কিছু স্মরণিকা-সংকলনও প্রকাশিত হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। তবে আমাদের জানা মতে, পঁচাত্তর-পরবতীকালে বাংলাদেশে ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ই হলো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত প্রথম স্মারক সংকলন- যেখানে কবিতা ছাড়াও মূল্যায়নধর্মী খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল। লেখক তালিকাটিও ছিল খুবই সমৃদ্ধ।

তখন কোনো সংকলনই পাঁচশ কপির বেশি ছাপা হতো না। আমরা সাহস করে ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’-এর বারোশ পঞ্চাশ কপি ছেপেছিলাম। প্রকাশের মাত্র এক মাসের মধ্যেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল সবক’টি কপি। তারপরও চাহিদা ছিল বিপুল। সারা দেশ থেকে অসংখ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কপির জন্য আমাদের ক্রমাগত তাগাদা দিয়েছেন। অগ্রিম টাকাও পাঠিয়েছেন অনেকে। দেশের বাইরে থেকেও আমরা বহু চিঠি পেয়েছি। তার মধ্যে আমেরিকার ‘লাইব্রেরী অব কংগ্রেস’-এর চিঠিও ছিল। তারাও বেশকিছু কপি কিনতে চেয়েছিল ঢাকার একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। কিন্তু সেনা শাসকদের অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ও ভীতির কারণে কোনো প্রেসই গ্রন্থটি পুনর্মুদ্রণ করতে রাজি হয়নি। পরে অবশ্য ১৯৯৮ ও ২০১০ সালে গ্রন্থটির আরও দু’টি ঢাউস সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। তবে সংকলনটি প্রথম প্রকাশের অভিজ্ঞতা আমাকে আজও শিহরিত করে।

আমাদের মধ্যে তীব্র ক্রোধ ছিল এ কথা সত্য। ছিল ঘাতকদের প্রতি পর্বতপ্রমাণ ঘৃণা। কিন্তু ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ কোনো তাৎক্ষণিক আবেগের ফসল ছিল না। বহু বিনিদ্র রাত আমরা উৎসর্গ করেছি এর পেছনে। আমাদের সাধ ছিল আকাশচুম্বী। প্রথমে আমরা ভেবেছি, বিশ্বের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকে এ ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করে তা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করবো বাংলা ও ইংরেজিতে। আমাদের বদ্ধমূল বিশ্বাস ছিল, ফিদেল ক্যাস্ট্রো ও ইন্দিরা গান্ধীসহ সেই সময়ের বিশ্ববরেণ্য নেতারা অবশ্যই এতে সাড়া দিবেন। আর তাদের সম্মিলিত প্রতিবাদ কেবল বিশ্বজনমত গঠনেই সহায়ক হবে না, বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমাদের বন্ধু কবি কামাল চৌধুরীও (বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপন ও বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক) ছিলেন এ-পরিকল্পনার অন্যতম ভাবসঙ্গী। কিন্তু সাধ থাকলেও সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সাধ্য আমাদের ছিল না। ফলে আমরা আমাদের ভাবনার বৃত্তকে সংকুচিত করে ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ প্রকাশে উদ্যোগী হই। আমাদের প্রাথমিক চিন্তা ছিল, বাংলা ভাষাভাষী অগ্রসর চিন্তার সকল বিবেকবান মানুষের প্রতিবাদ ও ঘৃণাকে একত্রে সংকলিত করে গ্রন্থাকারে তা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা। আমাদের পথ যে কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না তা বলা বাহুল্য মাত্র।

সংকলনটি প্রকাশের উত্তেজনায় আমরা এতোটাই আচ্ছন্ন ছিলাম যে শুরুতে অর্থসংস্থান কীভাবে হবে সে-কথা আমরা একবারও ভাবিনি। এ কারণে পরে আমাদের অনেক ভুগতেও হয়েছে। কিন্তু আমরা তা গ্রাহ্য করিনি। লেখার জন্যে লেখক, কবি ও বুদ্ধিজীবীদের দুয়ারে দুয়ারে ধরনা দিয়েছি। চট্টগ্রাম থেকে এসে দিনের পর দিন পড়ে থেকেছি ঢাকায়। ঢাকার পথঘাট ভালো চিনতাম না। অগ্রজ কবীর আনোয়ার (চলচ্চিত্র নির্মাতা), কবিবন্ধু জাফর ওয়াজেদ (বর্তমানে পিআইবি’র মহাপরিচালক), রেজা সেলিম ও মুজাহিদ শরীফকে নিয়ে খ্যাত-অখ্যাত প্রায় সব বুদ্ধিজীবী ও লেখকের দরোজার কড়া নেড়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফরিদপুরের সন্তান ‘স্বকীয়তা’ সম্পাদক ইসরাইল খানও (বর্তমানে বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক) আমাদের অকুণ্ঠ সহায়তা দিয়েছেন। অভিজ্ঞতা তিক্ত-মধুর। বোস প্রফেসর আবদুল মতিন চৌধুরী, ড. মযহারুল ইসলাম ও আবু জাফর শামসুদ্দীনসহ কেউ কেউ সস্নেহে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। কেঁদেছেন শিশুর মতো। আবার অনেকে মুখের ওপর দরোজা বন্ধও করে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বিশেষ অনুগ্রহভাজন ব্যক্তির সংখ্যাও কম ছিল না। তবে আমরা হাল ছেড়ে দেইনি। আমাদের সৌভাগ্য যে অন্নদাশঙ্কর রায় ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখাও আমরা পেয়েছিলাম। কবি বেলাল চৌধুরীর মাধ্যমে সেই লেখা আমাদের হস্তগত হয়েছিল।

‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ যৌথভাবে সম্পাদনা করেছিলাম আমি ও আমার সহপাঠী দিলওয়ার চৌধুরী। আমরা উভয়ে তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। আর গ্রন্থটি মুদ্রণের দুঃসাহস দেখিয়ে আমাদের হৃদয জয় করে নিয়েছিলেন নিবেদন প্রেসের কর্ণধার মহিউদ্দিন শাহ আলা নিপু। পাশে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে আরও কেউ কেউ অবশ্যই ছিলেন। তার মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য দুটি মানুষের কথা আমাকে বলতেই হবে। তারা হলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবু ছালেহ ও ছাত্রনেতা বশির উদ্দিন মাহমুদ-যার কথা আগেই বলা হয়েছে। ছালেহ ভাই দিনের পর দিন আমাদের নিয়ে পায়ে হেঁটেই সারা শহর চষে বেড়িয়েছেন অর্থ সংগ্রহের জন্যে। হাত পেতেছেন অনেকের কাছে। খুব যে সাড়া পাওয়া গেছে তা বলা যাবে না। তবে ছালেহ ভাই সেদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তা আমাদের আজও প্রেরণা জোগায়। অথচ তাঁর নিজেরই তখন খুব খারাপ অবস্থা। তা সত্ত্বেও তাঁর বৃহৎ হৃদয়ের দরোজা সব সময়ই খোলা ছিল আমাদের জন্যে। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে আমাদের বন্ধু ও নেতা।

সংকলনটির প্রচ্ছদ করেছিলেন সেদিনের ঝকঝকে তরুণ কবি ও ভিন্নধারার খ্যাপাটে শিল্পী খালিদ আহসান। সংকলনের নামটিও তার দেওয়া। এ নাম নিয়ে আমাদের মধ্যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দ্বিধা ছিল। আমি চেয়েছিলাম কড়া প্রতিবাদী একটি নাম দিতে। আমার পছন্দের একটি শিরোনাম ছিল ‘আবার যুদ্ধে যাবো’। আমার তখন মনে হয়েছিল, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি। দেশকে রাহুমুক্ত করতে হলে আমাদের আরও একটি মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে।

পরে ১৯৮০ সালের ১৫ আগস্টে আমরা ‘আবার যুদ্ধে যাবো’ নামে একটি বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করি, যা পঁচাত্তরপরবর্তী প্রতিবাদী ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এ গ্রন্থভুক্ত হয়েছে। এটাকে এক অর্থে ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’-এর সম্পূরক প্রকাশনাও বলা যেতে পারে। কারণ ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’-এ আমরা যে ক্ষোভ ও জনপ্রতিবাদকে ভাষা দিতে চেয়েছিলাম, এ প্রকাশনাটিতে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল। এতে সেই সময়ের দেশবরেণ্য রাজনীতিক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের বঙ্গবন্ধুর হত্যার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছিল। আমার বিশ্বাস, এই বুলেটিনটি বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তীকালে প্রকাশিত প্রতিবাদী ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম একক কাব্যগ্রন্থটিও প্রকাশিত হয় এপিটাফ প্রকাশনী থেকে। মহাদেব সাহার সাড়া জাগানো এ-গ্রন্থটি আমরা প্রকাশ করি ১৯৮২ সালে। চার ফর্মার এ-কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত বহু কবিতা তখন প্রতিবাদী তরুণদের মুখে মুখে ফিরতো। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে’। বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করা এ-গ্রন্থটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে আমার জীবন। বেশ কিছুদিন পালিয়ে বেড়াতে হয় আমাকে। দেশে তখন লে. জে. এরশাদের স্বৈরশাসন। সামরিক শাসনের কোপানলে পড়ে মাঝপথে থেমে যায় আমাদের এ ক্ষুদ্র প্রতিবাদী প্রকাশনা উদ্যোগটি। তবে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র পরিসরে ‘ভয় হতে অভয় মাঝে’ আমাদের যে-যাত্রা শুরু হয়েছিল তা ততদিনে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। সেদিনের সামান্য চারাগাছটি পরিণত হয়েছে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের অসামান্য এক মহীরুহে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের সকল উদ্যোগ-আয়োজনে তারই প্রতিফলন আজ দিবালোকের মতোই স্পষ্ট।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক; পরিচালক, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র


ঢাকা/তারা/নাসিম 


     



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

ওসমানীতে আরপি-পিসিআর মেশিন

২০২০-০৩-৩১ ২:৪৭:৪৬ এএম

মিরপুরে অগ্নিকাণ্ড

২০২০-০৩-৩১ ২:৩৮:২১ এএম

সরকারি ছুটি বাড়তে পারে

২০২০-০৩-৩১ ১:২৬:৪১ এএম