এমন লকডাউন দিয়ে লাভ কী?

প্রকাশ: ২০২০-০৪-২৭ ৮:৫৫:২৫ পিএম
তাসলিমা পারভীন বুলাকী | রাইজিংবিডি.কম

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে পুরো দেশ কার্যত লকডাউন। দেশের মানুষ যেন নির্বিঘ্নে ঘরে থাকতে পারে সেজন্য সরকার বিভিন্ন প্রণোদনার পাশাপাশি দফায় দফায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে।

এখন পর্যন্ত পাঁচবারে আগামী মাসের পাঁচ তারিখ পর্যন্ত সাধারণ ছুটি বর্ধিত করা হয়েছে। নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন ধরনের জনবান্ধব পদক্ষেপ। এর মধ্যে মানুষের ঘরে থাকাসহ সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার জন্য চালানো হচ্ছে বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা। কিন্তু সাধারণ মানুষ এসব উপেক্ষা করছে। প্রথম ছুটির সময় আমরা দেখেছি, হাজার হাজার মানুষ রাজধানী থেকে গ্রামে ফিরে গেছেন। এরপর গ্রামে ফিরেও তারা হোম কোয়ারেন্টাইন মেনে চলেননি।

পরবর্তী সময়ে বিজিএমইএ থেকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের কাজে যোগদানের জন্য বলা হলে সড়কে রাজধানীমুখী মানুষের ঢল নামে। সেসময় গণ-পরিবহন না পেয়ে পায়ে হেঁটে শত মাইল পথ পাড়ি দিয়েছেন অনেকে। এর একদিন পর আবারও ছুটি বর্ধিত করা হলে মানুষের পুনরায় গ্রামে ফেরার চরম বিড়ম্বনাও আমরা দেখেছি।

সেসময় কিছু কলকারখানাতে ছুটি দিয়ে দিলেও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বেশ কিছু কারখানাতে শ্রমিকদের কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে। এরপর সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে বকেয়া বেতনের দাবিতে প্রতিদিনিই শ্রমিকদের বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে। সেখানেও হচ্ছে ব্যাপক জনসমাগম।

অন্যদিকে, প্রতিদিনই দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের সরকারপ্রদত্ত চাল যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে তাতে মানা হয় না নিরাপদ দূরত্ব। আবার দেশের অবস্থাশালীরা দরিদ্র ও প্রান্তীক মানুষকে যে ত্রাণ দিচ্ছেন সেখানেও সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না বললেই চলে। এছাড়া, ত্রাণের জন্য রাস্তায় বিক্ষোভ, মিছিলও করতে দেখা গেছে।

লকডাউনে যানবাহন বন্ধ থাকলেও থেমে নেই মানুষের যাতায়াত। অভিযোগ আছে, সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ঘুষ দিয়ে স্বল্প পরিসরে মানুষ লুকিয়ে যাতায়াত করছেই। দিনে না পারলেও রাতে ট্রাক লরিতে যাতায়াত থেমে নেই। তাই জেলায় জেলায় লকডাউন ঘোষণা করলেও সেভাবে পালন হচ্ছে না।

আবার, যেখানে সন্ধ্যা ৬টার পর অপ্রয়োজনে বের হলে শাস্তির বিধান জারি করা হয়েছে। মসজিদে সাধারণ মুসল্লিদের যাতায়াত সীমিত করা হয়েছে। জুমার জামাতে যেতে মানাসহ ঘরে তারাবি পড়তে বলা হয়েছে। এই অবস্থায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি জানাজায় লাখো মানুষের বিশাল জমায়েত হতে দেখা গেছে। লকডাউনের মধ্যে এমন জমায়েত কীভাবে হয় এ নিয়েও হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।

মোদ্দাকথা, দেশের সাধারণ মানুষ সরকার ঘোষিত এই লকডাউন পুরোপুরি মানছে না। পেটের তাগিদে হোক, আর যে কারণেই হোক তারা ঘরে থাকছে না। মেনে চলছে না সামাজিক দূরত্ব।

অন্যদিকে, লকডাউনে বাণিজ্য, শিল্পোৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি, বিনিয়োগ তথা প্রাইভেট সেক্টর বেশিদিন বন্ধ থাকলে সারাদেশে নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, জরুরি ওষুধ ও কাঁচামাল ইত্যাদি আমদানি ও সারাদেশে সরবরাহ অব্যাহতভাবে চালানো খুব বেশি দিন সম্ভব হবে না। কারণ এসব পণ্য আমদানি, বন্দর থেকে ছাড়করণ এবং সারাদেশে পরিবহন বন্ধ থাকলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে। তাই, কিছু কিছু সরকারি দপ্তর যেমন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এবং এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি খাত, গ্যাস, বিদ্যুৎ ইত্যাদি উৎপাদনের দপ্তর খোলা রাখা আবশ্যক। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নবায়নের জন্য এসব দপ্তর চালু রাখা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। যাতে করে প্রয়োজনীয় সেবা উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব হয়। না হলে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না।

অন্য দিকে, সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি প্রায় ১ মাস হতে চলেছে। দীর্ঘ এই সময়ে দেশের প্রতিটি উৎপাদনমুখী সেক্টর বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে চলতি বছরের ২০ এপ্রিল, ‘প্রথম আলো’র একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—‘করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় গত ২৬ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে যে অবরুদ্ধ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ১ লাখ ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি (অনুমিত) হবে। আর অবরুদ্ধ পরিস্থিতি মে মাস পর্যন্ত চললে ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি হতে পারে। এক গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে কৃষি, শিল্প ও সেবাখাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রতিদিন ৩  হাজার ৩০০ কোটি টাকা।’

এছাড়া, করোনার কারণে ক্ষতি বহুমাত্রিক বলে মনে করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো নাজনীন আহমেদ। তিনি এই গবেষণার সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, প্রকৃত ক্ষতি এর চেয়েও বেশি হতে পারে।

তাই, সরকার করোনা পরিস্থিতিতে এর ভয়াবহতা থেকে মুক্তির জন্য দেশের এতো বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি স্বীকার করে দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য যে দফায় দফায় ছুটি বর্ধিত করেই চলেছেন, এর মর্ম উপলব্ধি না করে যদি আমরা সরকার নির্দেশিত আইন-কানুন না মেনে চলি, তাহলে এমন লকডাউন দিয়ে কী লাভ?

লেখক: সাংবাদিক


ঢাকা/তারা


     




আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

ক্রিকেটের রেকর্ড থেকে

২০২০-০৬-০৩ ৯:০৭:২১ এএম

রেল কি করোনা এক্সপ্রেস ?

২০২০-০৬-০৩ ৮:০৮:২৬ এএম

জিপিএ-৫ পেয়েও কাঁদছেন তানিয়া

২০২০-০৬-০৩ ৩:৩২:৪৪ এএম

৮২ কোচ পেলেন মাশরাফির ‘উপহার’

২০২০-০৬-০৩ ১:২২:৪১ এএম