খালেদা জিয়ার কারাজীবনের ৭৭৫ দিন

প্রকাশ: ২০২০-০৩-২৫ ৪:৩০:৪৯ পিএম
মামুন খান | রাইজিংবিডি.কম

আইনমন্ত্রীর এক ঘোষণায় পাল্টে যায় দৃশ্যপট।  বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির খবরে যেমন স্বস্তি পেলেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।  তেমনি প্রধানমন্ত্রীর উদারতার প্রশংসাও করেন সব শ্রেণির মানুষ।

২৪ মার্চ সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই খালেদা জিয়াকে ৬ মাসের জন্য মুক্তি দেওয়া হচ্ছে।  আর এ ঘোষণার মধ্য ৭৭৫ দিনের জেলজীবনের অবসান হলো বিএনপি চেয়ারপারসনের।

যেভাবে কারাজীবন শুরু: ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি।  রাজনৈতিক অঙ্গনে দিনটি ছিল উত্তেজনাপূর্ণ।  এদিন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা প্রথম মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।  তাই সবার দৃষ্টি ছিল আদালতের দিকে। 

এদিকে, সকাল থেকে গণমাধ্যমকর্মী, আইনজীবীরা ভিড় করেন পুরান ঢাকার বকশীবাজারে অস্থায়ী আদালতের ওই এলাকায়। চানখারপুল এলাকা থেকে বকশী বাজার পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়।  জনগণের চলাফেরাও নিয়ন্ত্রণ করা হয়।  পুরো এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ডেকে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।  ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর তখনকার বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান সকাল ১০টা ২০ মিনিটে আদালতে প্রবেশ করেন।  এরপর থেকে খালেদা জিয়ার অপেক্ষায় থাকেন সবাই। আসছে, আসছেন করে বেলা পৌনে ১২টার দিকে গুলশানের ফিরোজা বাসা থেকে আদালতের উদ্দেশ্যে বের হন খালেদা জিয়া।  নেতাকর্মীরা তাকে আদালতে পৌঁছে দিতে চান। নিরাপত্তার কারণে হাইকোর্ট মোড় পর্যন্ত তারা খালেদা জিয়ার সাথে সাথে ছিলেন।  এরপর পুলিশ তাদের আর থাকতে দেয়নি।  দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে আদালতে এসে পৌঁছান খালেদা জিয়া।  ২টা ১১ মিনিটে রায় পড়তে আদালতে ওঠেন বিচারক।  মোট ৬৩২ পৃষ্ঠার রায়ের বিশেষ অংশ পাঠ করেন বিচারক। প্রায় ১৫ মিনিট বিচারক মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণী তুলে ধরেন। এরপর ২টা ২৫ মিনিটের দিকে বিচারক রায় ঘোষণা করেন।  রায়ে খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। 

রায় ঘোষণার পর বেলা ২টা ৫০ মিনিটের দিকে কড়া পুলিশি পাহারায় খালেদা জিয়াকে ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের পুরোনো সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখানে তিনতলা ভবনের নিচতলায় দুটি রুমে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে খালেদা জিয়ার দেখভালের জন্য গৃহপরিচারিকা ফাতেমা বেগমকেও আদালতের নির্দেশে পাঠানো হয়।

পরে দণ্ডিত হওয়ার সাজার কারণে খালেদা জিয়া জাতীয় নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে যান। এদিকে অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ের পর দীর্ঘ সাত মাস খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করেনি কারাকর্তৃক্ষ। এরই মাঝে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে কারাগারে আদালত বসানোর বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় সরকারের পক্ষ থেকে। এরপর ২০১৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়াকে চ্যারিটেবল ট্রাস্টের মামলায় হাজির করা হয়।  কারাগারে আদালত বসানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেন খালেদা জিয়া। তিনি আদালতকে বলেন, আমাকে সাজা দেওয়ার জন্য এখানে আদালত বসানো হয়েছে। এখানে ন্যায়বিচার নেই।  ইচ্ছামতো বিচার হচ্ছে। তাছাড়া আমি অসুস্থ, বারবার এখানে আসতে পারব না।  আপনাদের যা মন চায়, যতদিন ইচ্ছা সাজা দিতে পারেন। এরপর ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার তারিখ ধার্য ছিল। কিন্তু ওই দুইদিন খালেদা জিয়া আদালতে আসতে অনিচ্ছুক বলে জানায় কারাকর্তৃপক্ষ।  এরপর দুদক খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে মামলার বিচারকাজ করার আবেদন করলে ২০ সেপ্টেম্বর আদালত তা মঞ্জুর করেন। এ আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতেও যান খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। উচ্চ আদালতও খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতে বিচারকার্য চলার আদেশ দেয়। এর মাঝে আসামিপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন না করলে রায়ের তারিখ ধার্যের আবেদন করে দুদক।  ১৬ অক্টোবর দুদকের আবেদন মঞ্জুর করে আদালত রায় ঘোষণার তারিখ ২৯ অক্টোবর ধার্য করেন। ২৯ অক্টোবর চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় আদালত খালেদা জিয়াকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। রায় ঘোষণার সময় খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন।  এ কারণে ওইদিন তাকে আদালতে হাজির করা হয়নি। ৭ অক্টোবর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।  প্রায় এক মাস চিকিৎসা শেষে ৮ নভেম্বর তাকে পুনরায় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই দিন তাকে নাইকো দুর্নীতি মামলায় আদালতে হাজির করা হয়।  এরপর নাইকো মামলার কয়েকটি ধার্য তারিখে খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করা হয়। এদিকে ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় আপিলে খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করেন হাইকোর্ট।

২০১৯ সালের ১ এপ্রিল চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয়।  এরপর থেকে তিনি সেখানেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর আগে ২০১৮ সালের ৭ এপ্রিল প্রথম দফায় খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউতে নেওয়া হয়।  সেখানে দুই ঘণ্টা ধরে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আবারও তাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

এদিকে, বিএসএমএমইউ এর চিকিৎসায় সন্তুষ্ট ছিল না খালেদা জিয়ার পরিবার। তাদের দাবি, খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন।  উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নিয়ে নিজ খরচে পরিবার চিকিৎসা করাতে চাই।  তবে এতে সাড়া মেলেনি আদালত বা সরকারের।  পরে খালেদা জিয়াকে বাঁচাতে প্যারোলে হলেও  মুক্তি চায় পরিবার।  আর দল চায় আইনি লড়াইয়ে মুক্ত করতে।  তাতেও ব্যর্থ হন আইনজীবীরা।

অবশেষে ২৪ মার্চ আইনমন্ত্রী আনিসুল হক তার বাসায় সংবাদ সম্মেলনে সরকারের নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি জানান।  করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তার বয়স বিবেচনায় মানবিক কারণে সরকার খালেদা জিয়াকে মুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান আইনমন্ত্রী। এ সিদ্ধান্তের ফলে দুই বছর দেড় মাস পর কারামুক্ত হতে যাচ্ছেন খালেদা জিয়া।  আবার ফিরছেন সেই ফিরোজাতেই।


মামুন/সাইফ


     



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

বিদেশফেরত অনেকেই আত্মগোপনে

২০২০-০৪-০১ ৫:১৫:৫৪ এএম