সমিতির আড়ালে ব্যাংকিং: হাজার কোটি টাকা লুট ও পাচার

প্রকাশ: ২০১৯-০৮-৩১ ৮:০৫:৪৭ পিএম
এম এ রহমান | রাইজিংবিডি.কম

এম এ রহমান মাসুম: লাখ টাকা জমায় মাসে দুই হাজার টাকা করে মুনাফা। এমন প্রলোভনে সমবায় সমিতির নামে শুরু। পরবর্তী সময়ে অজ্ঞাত যাদুর ছোঁয়ায় পুরো মাত্রায় ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান।

ব্যাংকিং কার্যক্রম তো বহু দূরের বিষয়, সমবায় অধিদপ্তর থেকে নেয়া সমিতির নিবন্ধনও ভূয়া। অথচ সমবায় অধিদপ্তর ও প্রশাসনের নাকের ডগায় ২০০৬ সাল থেকে উচ্চ হারের সুদের প্রলোভন দেখিয়ে দি ঢাকা আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেড বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো চেক বই, মেয়াদী আমানত, মাসিক সুদ প্রদানের সুবিধাসহ বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে জনগণের সঙ্গে করেছে ব্যাংকিং প্রতারণা।

লোপাট হয়েছে হাজার কোটি টাকা। যার অধিকাংশ মালয়েশিয়ায় পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ১৯৪০ সালের সমবায় আইনের আওতায় অর্থিক কার্য্ক্রমে ১টির বেশি শাখা খোলার নিষেধ থাকলেও আরবার কো অপারেটিভ রাজধানীর মতিঝিল ও মিরপুর, ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ, বাগেরহাট, খুলনা, জামালপুর, ময়মনসিংহসহ অন্তত ৩৮ জেলায় চলেছে অবৈধ ব্যাংকিং।

একস্থানে বড় সাইনবোর্ড দিয়ে কার্যক্রম শুরু করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কিছুদিন পরই বন্ধ করে অন্য জেলায় চলেছে অবৈধ ব্যাংকিং। সমবায় অধিদপ্তরের দেখভালের কথা থাকলেও তাদের নাকের ডগায় চলছে এমন জালিয়াতি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই সমবায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সহযোগিতা করেছেন। যার প্রমাণ প্রতিবছর অডিট হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ ৩৬ বছরে কোনো অডিট হয়নি।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানেও এরূপ ২০ থেকে ২৫টি সমবায় সমিতির খোঁজ মিলেছে। যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মাঠে নেমেছে দুদক। এরই মধ্যে ২০১৪ সাল থেকে দীর্ঘ ৫ বছর অনুসন্ধান শেষে সংস্থাটির উপ-পরিচালক সেলিনা আখতার বাদী হয়ে একটি মামলা করতে সক্ষম হন। গত ২৫ আগস্ট দায়ের করা মামলায় দি ঢাকা আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল আলম ও তার স্ত্রী ও দি ঢাকা আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংকের সভাপতি মিসেস তাহমিনা বেগমসহ সাত জনের বিরুদ্ধে প্রায় ১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। আসছে আরো ডজন খানেক মামলা।

এ বিষয়ে দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেডের বিরুদ্ধে দুদক সম্প্রতি একটি মামলা দায়ের করেছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। ভবিষ্যতে আমাদের আইনি পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।’

অনুসন্ধানে দেখা যায়, দি ঢাকা আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেড ১৯৬৯ সালের ২৭ অক্টোবর সমবায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধন (নিবন্ধন নং-৭১০) দেখালেও কখনোই নিবন্ধিত হয়নি। এমনকি এ সংক্রান্ত কোনো নথি সমবায় অধিদপ্তরেও সংরক্ষিত নেই। শুধু কি তাই, ব্যাংকিং নামে কোনো নথি না থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ ৩৬ বছর পূর্বের ওই ভূয়া নিবন্ধন ও একটি ভূয়া লিকুইডেশন (অবসায়ন) নম্বর-৩৩৩৮ দেখিয়ে অসাধু কিছু সমবায় কর্মকর্তার যোগসজশে দি আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেড সারা দেশে শাখা খুলে অবৈধ ব্যাংকিং শুরু করে। নথিপত্রে ১৯৪০ সালের দি বেঙ্গল কো-অপারেটিভ অ্যাক্টের অধীনে ওই সুবিধা দেয়া হয়েছে বলে তাদের দাবি ছিল। ১৯৬৯ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত অজ্ঞাত প্রভাবে কোনো অডিট করেনি সমবায় অধিদপ্তর। ফলে প্রতারক চক্র থেকে গেছে আড়ালে ও বহাল তবিয়তে।

আরবান কো-অপারেটিভের বিরুদ্ধে ৬/৭ বছর আগে থেকে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থাকলেও একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবে সমবায় অধিদপ্তর থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয় অবৈধ সুবিধা দিয়ে সমবায় অধিদপ্তরের সাবেক উপসহকারী নিবন্ধক খবির খান ও  সাবেক জেলা অডিটর লুৎফর রহমান অবসর নেওয়ার পরপর নিজেরাই দি আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাথে যুক্ত হয়ে সরাসরি আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন বলে দুদকের অনুসন্ধানে প্রমাণ মিলেছে।

রফিকুল আলম ও তার স্ত্রী তাহমিনা ছাড়া দুদকে দায়ের করা মামলার অন্যান্য আসামিরা হলেন, দি ঢাকা আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান ভূইয়া, সমবায় অধিদপ্তরের যুগ্ম নিবন্ধক মো. মিজানুর রহমান, জেলা সমবায় অফিসের জেলা অডিটর (অবসরপ্রাপ্ত) মো. লুৎফর রহমান, সাবেক উপ-সহকারী নিবন্ধক মোঃ খবির খান ও পরিদর্শক মহসিন মজুমদার।

এজাহার সূত্রে জানা যায়, আসামিরা পূর্বের ভুয়া নিবন্ধন নম্বর, ভুয়া লিকুইডেশন নম্বর  ব্যবহার করে দি আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংক নামের ভুয়া সমবায় সমিতি করে সমবায় আইন লংঘন করেছেন। এরপর সারাদেশে ওই প্রতিষ্ঠানের শাখা খুলে অবৈধ ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে উচ্চ হারে লাভের প্রলোভন দেখিয়ে জনগণের কাছ থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। পরবর্তী সময়ে জনগণকে তাদের প্রাপ্য টাকা ফেরত না দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে দেশে বিদেশে হস্তান্তর, রূপান্তর করে আত্মসাৎ করেছেন আসামিরা। এজাহারে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে।

এর আগে প্রায় ২০ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে ৭০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে ২০১৪ সালে মাঠে নেমেছিল দুদক। অনুসন্ধান পর্যায়ে ৪ বার অনুসন্ধান কর্মকর্তা বদল হয়। অধিকাংশ কর্মকর্তা আরবান কো-অপারেটিভকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সনাক্ত করে অভিযোগ দুদকের তফসিলভুক্ত নয় বলে পরিসমাপ্তির সুপারিশ করেছিল।

২০০৬ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও এমডিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ওঠে। প্রতি মাসে লাখে দুই হাজার টাকা করে মুনাফার লোভ দেখানো হয় তাদের। প্রথম দিকে কোনো কোনো আমানতকারী লাভের টাকা পেলেও এক সময় ব্যাংকটির বিভিন্ন কার্যালয় বন্ধ করে কর্মকর্তারা পালিয়ে যান।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩১ আগস্ট ২০১৯/এম এ রহমান/শাহনেওয়াজ


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

টস জিতে বোলিংয়ে বাংলাদেশ

২০১৯-০৯-২১ ৬:০৭:১৩ পিএম

শফিকুল ১০ দিনের রিমান্ডে

২০১৯-০৯-২১ ৫:২৫:১০ পিএম

বাবার সাথে ঢাকার পথে মিন্নি

২০১৯-০৯-২১ ৫:২২:২৮ পিএম

কাল থেকে জাবির ভর্তি যুদ্ধ শুরু

২০১৯-০৯-২১ ৫:১৯:১২ পিএম