গ্যাং কালচার : সন্ত্রাসী বানানোর কারখানা

প্রকাশ: ২০১৯-০৯-১০ ৭:২১:২৮ পিএম
মাকসুদুর রহমান | রাইজিংবিডি.কম

মাকসুদুর রহমান : মো. আলভি (ছদ্মনাম)। নবম শ্রেণির ছাত্র। উত্তরা নাইন এম এম গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড। গ্যাং কালচারে সে ইতোমধ্যে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী বনে গেছে। তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ ৪ টি মামলা রয়েছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য আছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রটি রাইজিংবিডিকে জানায়, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, মাদক-অস্ত্র বিক্রি, মাদক সেবন, মেয়েদের উত্যক্ত, এমনকি চুরি-ছিনতাইয়ের পাশাপাশি সহপাঠীকে অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবি তাদের গ্রুপের নিত্যদিনের কাজে পরিণত হয়েছে। বড় বড় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে গোপনে সখ্যতা গড়েতোলা থেকে সব কিছুই করছে তারা।

পুলিশ বলছে, রাজধানীতে প্রায় ৬০টি গ্যাং রয়েছে। সেখানে আলভীর মত এক থেকে দু’জন সন্ত্রাসী আছে যারা গ্রুপের প্রধান। তারা ইতোমধ্যে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হয়ে নিজেদের আড়ালে রেখেছে। এসব কিশোররা পলাতক বা আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিনিয়ত।

গ্যাং কালচার এখন সন্ত্রাসী তৈরির কারখানা হয়ে উঠেছে উল্লেখ করে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, অতীতে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসী একইভাবে গ্যাং কালচার করে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী বনে যায়।

সুব্রত বাইন ছিল সেভেন স্টার গ্রুপের। এছাড়া বিকাশ-প্রকাশও গ্যাং কালচারে জড়িত ছিল। অন্যরাও কোন না কোন গ্রুপে একীভূত হয়ে টপ টেরর হয়েছে। আর এখন যারা গ্যাং কালচারে জড়িত তারা কিশোর হলেও পূর্বসুরীদের অনুসরণ করছে। অনেকেই একে ৪৭ রাইফেল, ছোট ছোট আধুনিক সব অস্ত্র মজুদে রেখেছে। গোপনে অস্ত্র-মাদক ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ছে। একই সাথে এমন কোন মাদক নেই, যা তারা সেবন করছে না।

মিরপুরে গ্যাং কালচারে জড়িত এক সদস্য জানান, বয়সে কিশোর হলেও অনেকেই এখন নামি-দামি গাড়ি ব্যবহার করছে। পকেটেও থাকে টাকার বান্ডিল। যা দেখে অন‌্যরাও দ্রুত প্রভাব প্রতিপত্তিশালী হবার বাসনায় লোভে পড়ে জড়িয়ে পড়ছে বড় বড় অপরাধে। আবার প্রতিটি গ্রুপের একটি করে নিজস্ব জায়গা আছে। যেখানে গোপনে সব ধরনের অপরাধ কিভাবে করা যায় তার পরিকল্পনা করা হয়। চলে দল বেঁধে মাদক সেবন। এদের পেছনে আবার এলাকার এক শ্রেণির বড় ভাই রয়েছে। যারা প্রতিনিয়ত কিশোরদের ব্যবহার করছে, মদদ দিচ্ছে।

এদিকে গ্যাং কালচার রোধে সরকারের শীর্ষ মহলের নির্দেশে নড়চেড়ে বসেছে পুলিশ ও র‌্যাব। তাদের তদন্তে ডিসকো বয়েস, বিগবস, বাইকার গ্যাং স্টার, নিউ নাইন স্টার, স্টার বন্ড গ্রুপ, ফাস্ট হিটার, কিশোর অপরাধীচক্রসহ আরও অনেক নামে কিশোর গ্রুপ রয়েছে রাজধানী ঢাকায়। সকাল-বিকাল-সন্ধ্যা কিংবা গভীর রাত পর্যন্ত তারা পাড়া-মহল্লার গলির মোড়, রাজনীতিক কার্যালয়ের সামনে এমনকি বিভিন্ন খাবারের দোকানের সামনে আড্ডা দেয়।

সোমবার বিকেলে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া পরিচালক লে. কর্নেল সরোয়ার বিন কাশেম রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘ এরই মধ‌্যে ১৩ টি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রায় ২ শতাধিক কিশোরকে। গ্যাং কালচার খুবই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এতে কোমলমতি ছাত্ররা ধ্বংসের দিকে চলে যাচ্ছে। তারা যেন বিপথগামী না হয় সেজন্য অভিযান অব্যাহত আছে।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি বাবা-মাকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নেহাল করিম।

তিনি বলেন, ‘সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে, এ বিষয়ে বাবা-মায়ের খবর রাখতে হবে। অস্বাভাবিক কিছু নজরে এলে তাকে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে। কিশোর অপরাধ দমনের চূড়ান্ত দাওয়াই হচ্ছেন বাবা-মা।’

এক হিসেবে দেখা গেছে, সারাদেশে বছরে কিশোর অপরাধ সংক্রান্ত গড়ে ৫ শতাধিক মামলা হচ্ছে। প্রতি বছর হত্যা ও ধর্ষণ সংক্রান্ত ২ শতাধিক ঘটনায় জড়িত কিশোররা। কয়েক বছরে সারাদেশে কিশোর গ্যাং কালচার এবং সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে ৮০ জনেরও বেশি কিশোর খুন হয়েছে।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯/মাকসুদ/নবীন হোসেন


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

শেষ ভালোর প্রত্যাশায়

২০১৯-০৯-২০ ১:২৯:০৭ এএম

খালেদের বিরুদ্ধে মাদকের আরেক মামলা

২০১৯-০৯-১৯ ১১:৩১:১৬ পিএম