মনিপুরের স্বাধীনতা কোন পথে?

প্রকাশ: ২০১৯-১০-৩১ ১:৩৯:০৫ পিএম
শাহেদ হোসেন | রাইজিংবিডি.কম

লন্ডনে মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে ভিন্নমতাবলম্বী দুই নেতা মনিপুরের  স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে এই খবরে তেমন একটা সাড়া পড়েনি। হয়তো এর পেছনে ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে। তবে মনিপুরে কী খুব একটা সাড়া পড়েছে এই ঘোষণায়?

প্রায় দুদিন হতে চললেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে এ ব্যাপারে কোনো উচ্চবাচ্য নজরে আসেনি। এই ঘোষণার পর মনিপুরের কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনও বিবৃতি দেয়নি। তবে যার অনুমতি নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন দুই নেতা, সেই মনিপুরি রাজা কিন্তু পুরো বিষয়টিকে অস্বীকার করেছেন। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে স্বাধীনতা চাওয়া একটি রাজ্যে হঠাৎ করে কেন এই পরিবর্তন।

একটু পেছনে ফেরা যাক। কোয়ালিশন ফর ইনডিজেনাস রাইটস ক্যাম্পেইন মনিপুর (সিরকা) প্রকাশিত ‘হোয়াই প্রিমার্জার পলিটিক্যাল স্ট্যাটাস ফর মনিপুর বইতে বলা হয়েছে, ১৮৯১ সনে মনিপুর ব্রিটিশ কলোনিতে রূপান্তরিত হয়। ১৯৪৭ সনের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত মনিপুর প্রিন্সলি স্টেট হিসাবে ব্রিটিশ শাসনে ছিল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর মনিপুরের রাজা মহারাজ বোধচন্দ্র  সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। ওই সময় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল অন্যান্য স্বাধীন রাজ্যগুলোর মতো মনিপুরকেও ভারতের অর্ন্তভুক্ত করার জন্য তোড়জোর শুরু করেছিলেন। ১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বরে মহারাজ বোধচন্দ্র মনিপুরের প্রশাসনিক সমস্যা সমধানের জন্য শিলংয়ে যান।  বল্লভভাই প্যাটেলের নির্দেশনায় ওই সময় একরকম অবরুদ্ধ করে রাখা হয় মহারাজকে এবং তাকে বাধ্য করা হয় ভারতের সঙ্গে অর্ন্তভুক্তির চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে। এর কয়েক বছর পর থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের চারা গজাতে শুরু করে। ৭০ এর দশকে সেই চারা মহীরুহে রূপ নিতে শুরু করে। ৯০ এর দশকে বিচ্ছিন্নতার দাবি ছিল তুঁঙ্গে। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সামাল দিতে বিপুল সংখ্যক আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করে ভারত। তাদেরক Armed Forces Special Powers Act (আসপা) এর অধীনে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়।

৯০ এর পরবর্তী সময় মনিপুরের স্বাধীনতার দাবি ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করে। একেবারে যে মিলিয়ে যায়নি  তা লন্ডনের সংবাদ সম্মেলনেই বোঝা গেছে। মাঝে মাঝে কিছু বিশেষ দিবসে স্বাধীনতার ডাক দেয় কিছু সংগঠন। ব্যস ওই পর্যন্তই।

সাউথ এশিয়া টেরোরিজম পোর্টালের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে লড়াইয়ে অন্তত ৬ হাজার ১২৭ জন নিহত হয়েছে।

২০১৭ সাল থেকে অবশ্য পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটতে শুরু করে। রাজ্যের পর্যটন খাতের উন্নয়নের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। ২০০৮ সালে সন্ত্রাসী হামলায় যেখানে নিহতের সংখ্যা ছিল ৪৮৫ জন, ২০১৭ সালে সেটি এসে দাঁড়ায় ৫৫ জনে। ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ইউনাইটেড কুকি লিবারেশট ফ্রন্ট ও কুকি ন্যাশনাল আর্মি শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।

গত বছর জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেইয়ের পক্ষ থেকে এক সাংবাদিক মনিপুর গিয়েছিলেন এক আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে।

মিলন সানজি নামে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী ওই সাংবাদিককে বলেন, ‘২০১২ সালের আগে মনিপুর বিক্ষোভ ও সহিংসতার জ্বলন্তভূমি ছিল। সেনাবাহিনী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সংঘাতে প্রাণ গেছে অনেকের। আমরা স্থানীয়রা জানি, মনিপুরের খারাপ সময় পেরিয়ে গেছে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে এখনো রাজ্যের সুনাম ভয় ও সর্বশেষ পরিস্থিতির তথ্য সরবরাহের জটিলতার কারণে কিছুটা চাপা পড়েছে।’

মনিপুরের এই স্বাধীনতার দাবি ফিকে হওয়ার পেছনে কেন্দ্রীয় সরকারের কিছুটা কৌশল কাজ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে মনিপুরের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের বেকারত্বের হার কমিয়ে আনা হয়, পর্যটনের দ্বার ধীরে ধীরে খুলে দিতে শুরু করে রাজ্য সরকার।

মনিপুরের অবস্থার যে পরিবর্তন হয়েছে তা ২০১৬ সালে ১৬ বছরের অনশন ভাঙ্গার পর হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন অধিকারকর্মী ইরম শর্মিলা। সেনাবাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইনের বিরুদ্ধে ১৬ বছর অনশনের পর মুক্তি পেয়ে ওই সময় শর্মিল জানিয়েছিলেন, তিনি রাজনীতিতে যোগ দিতে চান এবং মুখ্যমন্ত্রীর পদে নির্বাচন করতে চান। পরবর্তীতে  পিপলস রিসার্জেন্স অ্যান্ড জাস্টিস অ্যালায়েন্স নামে রাজনৈতিক দল গড়েন তিনি। এই দলের হয়ে ২০১৭ সালের নির্বাচনে অংশ নেন। মনিপুরের তিন মেয়াদের মুখ্যমন্ত্রী ওকরাম ইবোবি সিংয়ের বিরুদ্ধে থৌবাল আসনে প্রার্থী হন তিনি। কিন্তু ২৭ হাজার ২৭১টি ভোটের মধ্যে মাত্র ৯০টি পান শর্মিলা।

২০১৭ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়ে এখন মনিপুরের মসনদে আছে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি। উন্নয়ন স্বপ্ন দেখিয়েই মোদির দল মনিপুরের স্বাধীনতার স্বপ্ন ভুলিয়ে দিতে চায়।


ঢাকা/শাহেদ


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

টিভিতে আজকের খেলা

২০১৯-১১-১৬ ২:২১:৪৪ এএম

সুরের মূর্ছনায় হেমন্তের রজনী

২০১৯-১১-১৬ ১:১৮:৫৭ এএম