২০০ কোটি টাকা পাচারে ফাঁসছেন ১৩ জন

প্রকাশ: ২০১৯-১১-০২ ৮:০০:৩৩ পিএম
এম এ রহমান মাসুম | রাইজিংবিডি.কম

ভুয়া রপ্তানি দলিল দেখিয়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার ও আত্মসাত করেছে এসবি এক্সিম বাংলাদেশ। অথচ নথিপত্রে টেরাকোটা টাইলস রপ্তানির জাল বিল দেখানো হয়েছে।

এতে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের সাবেক ব‌্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) ৯ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তালিকায় আছেন তিন সিঅ‌্যান্ডএফ এজেন্টের মালিকও। সব মিলিয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মামলায় ফাঁসছেন ১৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।

সংস্থাটির অনুসন্ধানে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে টাকা পাচারের প্রমাণ পাওয়ায় এরইমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মামলার অনুমোদনও দিয়েছে। শিগগিরই মামলা দায়ের করা হচ্ছে বলে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র রাইজিংবিডিকে নিশ্চিত করেছে।

মামলায় যারা আসামি হচ্ছেন- ঝিনাইদহের প্রতিষ্ঠান এসবি এক্সিম বাংলাদেশ গ্রুপের মালিক শাহজাহান বাবলু, কমার্স ব্যাংকের সাবেক এমডি রুহুল কুদ্দুস মোহাম্মদ ফোরকান, ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ট্রেড ডিভিশনের প্রধান কর্মকর্তা কাজী রেজাউল করিম, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাফর আলম, সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ট্রেড প্রধান কামরুজ্জামান আকন্দ, প্রধান শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক আফজাল হোসেন খান, দিলকুশা শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক ফকির নাজমুল আলম, প্রধান কার্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহিনুজ্জামান, ঢাকার মৌলভীবাজার শাখার সাবেক অপারেশন ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম ও সাবেক কর্মকর্তা জামাল হোসেন।

এছাড়া, মামলায় ফাঁসছেন সিঅ‌্যান্ডএফ এজেন্ট সৈকত এন্টারপ্রাইজ, জামান এন্টারপ্রাইজ ও সামোয়া ট্রেডিং করপোরেশনের মালিকরা।

এ বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সহিদুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে রাইজিংবিডির কাছে মামলার অনুমোদনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন তিনি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে এসবি এক্সিম গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো ধরনের সহায়তা করেননি। এমনকি ই-মেইল পাঠিয়ে জানতে চাইলেও প্রতিষ্ঠানটির কোনো বক্তব্য জানা যায়নি।

অনুসন্ধান প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, এসবি এক্সিম বাংলাদেশ ২০১৮ সালের বিভিন্ন সময়ে ১০টি টেলিফোনিক ট্রান্সফারের (টিটি) মাধ্যমে ব্যাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেডের দিলকুশা শাখার সহযোগিতায় ২ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার বা ২ কোটি টাকা অবৈধভাবে এক্সপোর্টার রিটেনশন কোটায় পাচার করেছে। এর বিপরীতে কোনো পণ্য বিদেশে রপ্তানি হয়নি। ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় সিঙ্গাপুরে অবস্থিত দুটি প্রতিষ্ঠানে পাচার হয় ওই অর্থ, যা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ধারা (২) এর (ফ),(অ),(ই),(এ) অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এছাড়া, রপ্তানি না হওয়া সত্বেও প্রতিষ্ঠানটি ৬৫টি বিল অব এক্সপোর্টের বিপরীতে ১ কোটি ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৯৩৩ মার্কিন ডলার বা ৯০ কোটি ১০ লাখ ৪২ হাজার ২০৪ টাকা আবার দেশে ফেরত এসেছে বলে দেখিয়েছেন। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে পাওয়া তথ্য ও তদন্তে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রকৃতপক্ষে কোনো রপ্তানি হয়নি। এটা মানিলন্ডারিং আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

অনুসন্ধানের বিষয়ে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা রাইজিংবিডিকে বলেন, এসবি এক্সিম নামের প্রতিষ্ঠানটির মালিক শাহজাহান বাবলু প্রকৃতপক্ষে কোনো পণ‌্য রপ্তানি না করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় ভুয়া রপ্তানি দলিল দাখিল করে অর্থ পাচার ও আত্মসাত করেছে। যেখানে ব্যাংক কর্মকর্তা ও পরিচালনা বোর্ডের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ ও সহায়ক ভূমিকা ছিল। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিঅ‌্যান্ডএফ এজেন্টদের বিরুদ্ধেও মানিলন্ডারিং অপরাধের প্রমাণ মিলেছে। এনবিআরের সুপারিশ থাকবে পুলিশের সিআইডি ও শুল্ক গোয়েন্দার সমন্বয়ে গঠিত যৌথ দলকে যেন মামলার তদন্তভার দেয়া হয়।

বিভিন্ন নথিপত্র পর্যালোচনা ও আসামিদের বক্তব্যের বিষয়ে অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসবি এক্সিম বাংলাদেশ দিলকুশা শাখা থেকে ১৭৪ কোটি টাকা গ্রহণ করে, যা সুদাসলে ১৯৮ কোটি টাকার বেশি দাঁড়িয়েছে। এসব অর্থ অন্য ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগে ব্যয় করেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ঋণের টাকা দিয়ে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের দিলকুশা শাখায় ৪৮ কোটি ২ লাখ, কৃষি ব্যাংকের স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের ২২ কোটি ৭৭ লাখ, ইসলামী ব্যাংক প্রধান কার্যালয় কমপ্লেক্স শাখায় ১৬ কোটি ৩৯ লাখ, প্রিমিয়ার ব্যাংক দিলকুশা করপোরেট শাখায় ২ কোটি ৫৫ লাখ, ইউসিবিএল ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখায় ১ কোটি ৭ লাখ টাকাসহ মোট ৯০ কোটি ৮০ লাখ টাকা ঋণ শোধ করা হয়েছে। এছাড়া, প্রতিষ্ঠানটি ওই ঋণের টাকা দিয়ে আমদানি বাবদ ১২ কোটি ৪৫ লাখ, বন্দর থেকে মালামাল ছাড় করা বাবদ ২ কোটি ২৮ লাখ, তিনটি বিদ্যুৎ সাবস্টেশন নির্মাণ বাবদ ১০ কোটি, ব্যক্তিগত ঋণ বাবদ ২৬ কোটি, জমি কেনা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন বাবদ ৫ কোটি, স্থানীয় বাজার থেকে মালামাল কেনা বাবদ ২৭ কোটিসহ ৮২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। সে হিসেবে মোট ১৭৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা খরচ করার তথ্য জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অর্থাৎ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য ও তথ্য-প্রমাণে আত্মসাত ও মালিলন্ডারিংয়ের প্রমাণ মিলেছে।

এ বিষয়ে চলতি বছরের ১৯ জুলাই সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল বলেছিলেন, ‘অর্থ পাচারকারী যতই শক্তিশালী হোক, এমনকি আমার পরিবারের সদস্য হলেও তাকে শাস্তির আওতায় আসতে হবে। যদি তিনি (শাহজাহান) করে থাকেন, তিনি যেই হোন, যত শক্তিশালী হোন, তার বাড়ি যেখানেই হোক, তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় আসতে হবে।’

এর আগে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে মাটির তৈরি টেরাকোটা টাইলস রপ্তানির নামে প্রায় ২০০ কোটি টাকা পাচারের রহস্য উদঘাটনে তদন্তে নামে এনবিআর। অভিযোগ ছিল আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে মাটির তৈরি টেরাকোটা টাইলস রপ্তানির বিপরীতে দেশে কোনো অর্থ আসছে না।

যেখানে দলিলপত্রে এসবি গ্রুপকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের তিনটি প্রতিষ্ঠানের টেরাকোটা টাইলস কেনার আদেশ দেখানো হয়। এ তিনটি প্রতিষ্ঠানই ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৭২টি ঋণপত্রের মাধ্যমে ৪ কোটি ১২ লাখ ৫২ হাজার ডলারের (৩৫০ কোটি টাকা) টাইলস আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলে। এসবি গ্রুপ যে টাইলস রপ্তানি করে, তার প্রতিটির দাম ধরা হয়েছিল ১০ ডলার। এছাড়া, বিদেশি চারটি ব্যাংকের নথিপত্র দেখিয়ে ঋণপত্র আদেশ তৈরি করা হয়েছিল, যা প্রকৃতপক্ষে জাল নথিপত্র ছিল।

এ অভিযোগ ‍উত্থাপিত হওয়ার পর গত ২৮ জুলাই বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের সাবেক এমডি ও ডিএমডিসহ শীর্ষ পর্যায়ের ১১ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত হয়।

এর আগেও প্রায় সাড়ে ২৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এসবি গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহজাহান বাবলু ও ছয় ব্যাংক কর্মকর্তাসহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে ২২ অক্টোবর দুটি মামলা করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলার এজাহারে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট তৈরি, বন্ধকি জমির জাল দলিল, নামজারির সার্টিফিকেট, ডিসিআর, দাখিলা, আরএস ও মহানগর খতিয়ানের কপি ইত্যাদি দাখিল করে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের দিলকুশা শাখা থেকে ওই টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ আনা হয়েছিল গ্রুপটির ঊর্ধ্বতনদের বিরুদ্ধে। অদৃশ্য কারণে মামলাগুলো এফআরটি (অভিযোগ থেকে অব্যাহতি) হয়েছিল।

** রপ্তানির নামে পাচার ২০০ কোটি টাকা, তদন্তে এনবিআর


ঢাকা/এম এ রহমান/রফিক


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী

২০১৯-১১-২০ ১:২৫:৩২ এএম

লবণকাণ্ড: ২২ ব্যবসায়ী আটক

২০১৯-১১-২০ ১:১৯:১২ এএম

এক শাকিবের দুই রূপ

২০১৯-১১-২০ ১২:০৮:০৭ এএম

সিলেটে চালের দোকানে লবণের বস্তা!

২০১৯-১১-২০ ১২:০৩:৫৪ এএম

সিদ্ধান্ত হয়নি বৈঠকে

২০১৯-১১-১৯ ১১:২২:১৩ পিএম

বৃত্ত-১২ রাঙিয়ে দিচ্ছে ক্যাম্পাস

২০১৯-১১-১৯ ১০:৪৮:২৬ পিএম

এসএ গেমসের জন্য বাংলাদেশ দল ঘোষণা

২০১৯-১১-১৯ ১০:৪৪:৪৫ পিএম

লবণ টক অব দ‌্য কান্ট্রি

২০১৯-১১-১৯ ১০:২৭:০৮ পিএম

অবশেষে জিতল ব্রাজিল

২০১৯-১১-১৯ ১০:১০:৫৮ পিএম