পাবে সামান্যে কি তার দেখা (শেষ কিস্তি)

প্রকাশ: ২০১৯-১০-২৯ ২:৫৮:২৬ পিএম
হুমায়ূন শফিক | রাইজিংবিডি.কম

দ্বিতীয়বার ঘুম ভেঙে গেলে দেখলাম সবাই উঠেছে। নিচে নেমে এলাম। ফরহাদ মজহারকে ঘিরে আড্ডা জমেছে খুব! সেখানে গিয়ে বসলাম। তিনি আল্লাহকে নিয়ে আলোচনা করছেন। আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। লা ইলাহা ইল্লালাহ। একজন নাকি নাস্তিক ছিলেন, পরে আস্তিক হয়েছেন। তিনি প্রথমদিকে শুধু লা ইলাহা পর্যন্ত বলতেন। আস্তিক হওয়ার পর সম্পূর্ণ কালেমা বলেন। এমন আরো অনেক আলোচনা।

‘আমি’ শব্দ নিয়েও বেশ আলোচনা হলো। আমি মানে যে শুধু আমিই না, আমি মানে সবাই। অন্যের আমিও আমি। মানে সবাই আমি। এই কথায় একটু খটকা থাকতে পারে, কিন্তু এই আমি সেই আমি নই।

লালন আখড়া

এবার সময় নিয়ে মেলা দেখতে বের হলাম। একতারার অভাব নেই, দামও খুব কম! ভাবলাম একতারা কিনব পরে, আগে ঘুরে ঘুরে মেলা দেখি। ভিতরে ঢুকতে বেশ কষ্টই হলো। ভিড় তো শেষ হয় নাই। দেখলাম বাচ্চাদের জন্য নাগরদোলা, চড়কি, নৌকা এসেছে। সবাই আনন্দ করছে, কিনছে। বিকেল হওয়ায় মেয়েদের সংখ্যা বেশি। রাত যত বাড়ে পুরুষের সংখ্যা তত বাড়ে। আমার মনে হলো ৪০-৫০ শতাংশ পুরুষ এখানে গাজা খেতে আসে। হিসেবে গণ্ডগোল থাকতে পারে। মেলা দেখতে দেখতে ক্ষুধা লেগে গেল। সামনে পেলাম তিলের খাজা। বিখ্যাত তিলের খাজা! কিনে নিলাম কয়েকটা। তিনজন ছিলাম। রোমেল ভাই হুট করেই ফোন দিলেন, হুমায়ূন কই? ভিতরে আসো। বাকি দুজনকে রেখে ভিতরে গেলাম। দেখি আবারও আড্ডা জমে উঠেছে। নতুন কিছু ছেলে এসেছে। তাদের নিয়ে বিভিন্ন কথাবার্তা হচ্ছে। আমিও বসে বসে শুনলাম। আমাদের রাতে বের হওয়ার কথা। কখন বের হবো কে জানে? এই ফাঁকে লালনকে মতিজান যেখানে পেয়েছিলেন সেখানে গিয়ে বসলাম। মনের মানুষ সিনামার কথা মনে পড়লো। কিন্তু জানি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মনের মানুষ’ বেশির ভাগই কাল্পনিক। কারণ লালন এই জায়গা ছেড়ে কখনো কোথাও যাননি।

বিভোর হয়ে সাঁইজির গান শুনছেন ভক্তবৃন্দ

সবাই এবার ঠিক করলাম কালীগঙ্গার তীরে যাব। সেই তীরেই নাকি শ্মশানঘাট। শ্মশান নিয়ে ছোটবেলা থেকেই আলাদা আগ্রহ। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পরে দেখি এ অন্য জগত। আমরা বারো-তেরোজন গিয়েছি। সবাই একটা জায়গায় বসে পড়লাম। এত লোক শ্মশানঘাটে চিন্তাও করতে পারিনি। যে যার মতো গান গাইছে, দম নিচ্ছে। ধোঁয়াগুলো উড়ে যাচ্ছে আপন খেয়ালে। আকাশের ভরা চাঁদের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সেখানে আবিষ্কার করলাম। আকাশের চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি- মনে পড়ে গেল। কতক্ষণ বসেছিলাম হিসাব ছিল না। এখানে এসে চট্টগ্রামের আরিফ ভাইয়ের সাথে দেখা। খুব ভালো মানুষ।  দাউদ ভাই, ফয়সাল ভাই তাদের সঙ্গেও কথা হলো। কোনো নতুন জায়গায় যাওয়া মানেই নতুন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক।

শ্মশানঘাট থেকে ফিরে এলাম। সবাই রাতের শেষ সিগারেট খেয়ে ভিতরে ঢুকে গেলাম। আশ্রমের অনেকেই ঘুমিয়ে গেছে। রওশন ফকির তখনও জেগে ছিল। আমরা কয়েকজন মিলে তার সামনে গিয়ে বসলাম। তিনি প্রথমেই বললেন, পাবে সামান্যে কি তার দেখা। এরপর ‘সময় গেলে সাধন হবে না’ গেয়ে বললেন, এখানে সবাই ভুল গায়। ‘দিন থাকিতে তিনের সাধন’ হবে। কিন্তু অনেকেই বলে ‘দিন থাকিতে দিনের সাধন’। বিশেষ করে মোল্লারা গানের ভুল ব্যাখ্যা দেয় বলে তিনি দুঃখপ্রকাশ করলেন। গুরু ভজন থেকে শুরু করে আরো অনেক কথা বললেন। শুনতে শুনতে আমরা যেন নতুন দুনিয়ার সন্ধান পেয়ে গেলাম। কোনোদিন যা শুনিনি তাই শুনলাম। একজনের সামনে গিয়ে বসলে সাথে সাথেই তো সব বলে দিবেন না। তার জন্য সময় দিতে হবে। আগ্রহ নিয়ে বসে থাকতে হবে।

লালনকে মতিজান এখানেই পেয়েছিলেন

পরদিন আমাদের রাতের বাস। সারাদিন করার মতো কিছু নেই। তাই সকালবেলা ঘুমিয়ে কাটালাম। উঠে সেবা নিয়ে বাইরে বের হলাম। আজকে সেই জনসমুদ্র নেই। গতকাল রাতেও ছিল মানুষের স্রোত। আজেকই সব হাওয়া। মেলাও দেখি নেই। সবাই চলে গেছে অন্য মেলায়। শুধু ডান দিকের মেলা রয়েছে। সেখানে লোকজন আসছে। হয়তো সন্ধ্যায় ভিড় হবে কিছুটা।

আমাদের আশ্রম থেকেও সবাই বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে। আমরা যখন বের হলাম তখন আর কেউ নেই। শুধু যারা রক্ষণাবেক্ষণ করেন তারাই আছে। তাদের থেকে বিদায় নিলাম। বের হয়ে একটা অটোতে উঠলাম। আর মনে মনে লালনকে স্মরণ করলাম- লালনকে কি সামান্যে পাওয়া যায়? (শেষ)


ঢাকা/তারা


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

টিভিতে আজকের খেলা

২০১৯-১১-১৬ ২:২১:৪৪ এএম

সুরের মূর্ছনায় হেমন্তের রজনী

২০১৯-১১-১৬ ১:১৮:৫৭ এএম