উনাবাতুনা- পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমুদ্র সৈকত-২

প্রকাশ: ২০১৯-০৮-১৪ ৬:১০:২২ পিএম
উদয় হাকিম | রাইজিংবিডি.কম

উদয় হাকিম, কলম্বো (শ্রীলঙ্কা) থেকে ফিরে: অসম্ভব সুন্দর সৈকত এই উনাবাতুনা। বৃক্ষশোভিত গ্রিন বিচ। পরিচ্ছন্ন, কোলাহলমুক্ত। নিচে লালচে বালু, উপরে সুনীল আকাশ। দখিনা খোলা হাওয়া। অন্যরকম আবেগ জাগাচ্ছিল। পায়ের নিচে শির শির অনুভূতি ছড়াচ্ছিল নরম বালুকনা। শিল্পীর ক্যানভাসে নীল জলের পাশে লালচে বালি- পুরো রিভার্স। এমন বৈপরিত্য মনোজগতে দোলা দেয়। পুরো সৈকত জুড়ে বাদামি আলো। সূর্যের রশ্মি স্পটলাইটের মতো সৈকতকে হাইলাইট করছিল।

অন্য দশটা সৈকতে কী হয়? ঢেউগুলো তীরের কাছে এসে বড় হয়। আছড়ে পড়ে তীরে। কিন্তু এখানকার চেহারা একটু ভিন্ন। আধা কিলো বা এক কিলো আগেই ঢেউগুলো অদৃশ্য কোনো সৈকতে বাধা পাচ্ছে। সেখানেই সাদা সাপের ফণার মতো মাথা উঁচু করছে। কারণ কী? কারণ হলো ডুবু পাথর। ওখানে অনেক শক্ত পাথর এবং পাথরের সারি রয়েছে জলের নিচে। সেখানে বাড়ি খেয়ে ফণা তুলছিল জলরাশি। কয়েকটা পাথুরে দ্বীপ মাথা তুলে দাঁড়িয়েও ছিল। ওই যে বলেছিলাম আগেই, রাক্ষসেরা হয়তো ওই পাথরগুলো ফেলেছিল।   

বাল্মিকির লেখা মহাকাব্য রামায়নে উনাবাতুনা সৈকতের কথা কীভাবে আছে, আগেই বলেছিলাম। তবে পুরনো কাহিনিতে উনাবাতুনার আরো অনেক গল্প রয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো- ভারতীয় এক অভিশপ্ত যুবরাজকে জাহাজ থেকে এখানে ফেলে দেয়া হয়েছিল। পৃথিবীর দেবী মনিমেকালাই ওই যুবরাজের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তিনি তাকে বাঁচানোর জন্য সমুদ্রের মধ্যে একটি পাথুরে দ্বীপ বা বালুচর তৈরি করেন। ওই যুবরাজ দ্বীপে অবস্থান করছিলেন। ওদিকে সতীত্বের দেবী পাত্তিনি ওই যুবরাজকে আগুনের প্রাচীর তৈরি করে উপকূলে আসতে বাধা দিয়েছিলেন। পুরানে বলা না থাকলেও অনুমান করা যায়, সতীত্বের দেবীর হয়তো সুদর্শন যুবরাজের প্রতি আকর্ষণ ছিল। যুবরাজ হয়তো অন্য নারীতে আসক্ত ছিলেন। সেই অন্য নারী কি তবে মনিমেকালাই? দেবী মনিমেকালাই নিষিদ্ধ ওই যুবরাজকে ঘিরে ব্যাপক সুনামি তৈরি করেছিলেন। ব্যাপারটা দুই দেবীর লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল। পৃথিবীর দেবী জলের তোড়ে আগুন নেভাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর ওই দেবী উনাবাতুনাতে এসেছিলেন। হয়তো সে কারণেই কি না বিশ্বের সেরা ১০০ সৈকতের মধ্যে এর নাম রয়েছে। বলা চলে, দেবীর মতোই সুন্দরী এই বিচ। ভাবছিলাম, পাহাড়, সমুদ্র আর ঘন অরণ্যবেষ্টিত এমন জায়গায় দেবী মনিমেকালাই এখনো আসে কি না। যদি দেখা হতো!

কথিত আছে, পরবর্তীতে ওই যুবরাজ উনাবাতুনাতে বাস করা শুরু করেন। বিভিন্নভাবে তিনি এলাকার লোকজনকে সহায়তা করতেন। বছরের পর বছর এই সৈকতে উপাসনা করেছেন। দ্বীপের পশ্চিম প্রান্তে গল ফোর্ডের সঙ্গে তার সমাধি রয়েছে। রয়েছে একটি উপাসনালয়ও। তবে অবাক ব্যাপার হলো, ওই যুবরাজের নাম জানে না কেউ। স্থানীয়রাও তার নাম জানেন না। অজ্ঞাত যুবরাজ হিসেবেই তার পরিচিতি। মুখে মুখে মিথ হয়ে ঘুরে বেড়ায় তার গল্প।

ছোটবেলায় মুখে মুখে শুনেছি প্রথম মানব আদম ছিলেন ২০০ ফুট লম্বা! বেঁচেছিলেন ৫০০ বছর! ভক্তদের দাবি- আদমের পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছে শ্রীলঙ্কায়। শ্রীলঙ্কার যে পাহাড়ের চূড়ায় তাকে নামানো হয়েছিলো তার নাম হয়ে গেছে অ্যাডামস পিক। পাহাড়ের চূড়ায় তার পায়ের বড় ছাপও রয়েছে!

উনাবাতুনার ওই যুবরাজ নাকি সৈকতের পশ্চিম তীরে ধ্যানমগ্ন থাকতেন, মানুষের উপকার করতেন। শেষ পর্যন্ত ওই সৈকতেই তার মৃত্যু হয়। গল ফোর্টের পশ্চিমের দেয়াল ঘেঁষে সমুদ্র তীরে রয়েছে তার সমাধি। এটিকে হাজার বছরের পুরনো সমাধি মনে করা হয়। কবরটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। অনেক লম্বা কবর। আদমের জ্ঞাতি গোষ্ঠীর কেউ ছিল কি ওই যুবরাজ? এত লম্বা মানুষ পৃথিবীতে আদৌ কি ছিল? সমাধির পাশেই একটা ছোট্ট উপাসনালয়। স্থানীয় ভাষায় ওই স্থানকে কোভিল বা দেবালয় মনে করা হয়। ওই কবর এবং উপাসনালয় ঘিরে রয়েছে বড় বড় কাছিমের আবাসস্থল। কেউ মনে করেন, কচ্ছপগুলো ওই ধ্যানি যুবরাজের ভক্ত। পরিবেশবিদরা যদিও বলেন, অনুকূল পরিস্থিতির কারণেই কচ্ছপগুলো ওখানে যায়। পাথরের ভাঁজে ডিম দেয়। বিশ্রাম নেয়। মিল্টন বলছিল, ওখানে গেলেই বড় বড় কচ্ছপ দেখা যায়। বিশ্বাস করেন, আমি কিন্তু দেখিনি একটাও!

সহযাত্রী ফিরোজ আলম আর মিল্টন দিলেন আরেক তথ্য। আগেরবার নাকি তারা ফোর্টের আশেপাশের লোকদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, ওই লম্বা কবরটি কার। স্থানীয় সাধারণ পাবলিকের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মযাজকদেরও প্রশ্ন করা হয়েছিল। জানতে চাওয়া হয়েছিল রক্ষীদের কাছেও। কেউ উত্তর দিতে পারছিলেন না। অবাক ব্যাপার। এত লম্বা একটা কবর, সুন্দর করে সংরক্ষণ করা; অথচ কার কবর কেউ বলতে পারছিল না!

যাহোক, সৈকত প্রসঙ্গে আসি। সার্ফিংয়ের জন্যও উনা সৈকতের বেশ খ্যাতি। অনেকেই সার্ফিং বোর্ড নিয়ে জলে নামছিল। তখন লাঞ্চের সময় ছিল বলে হয়তো পর্যটক খুব কম। সার্ফার বা সুইমারদের সংখ্যাও ছিলো হাতেগোনা। খিদে পেয়েছিল বলে আমরাও কিছু দূর হেঁটে নিরিবিলি একটা রেস্টুরেন্টে খাবার অর্ডার দিলাম। খুব গরম। রেস্টুরেন্টের সামনে একটি কোঠর (গাছের কোঠরের মতো) দোলনা ছিল। ক্লান্তিতে সেখানে বসে পড়েছিলাম। মিল্টন দেখলাম সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল ক্যামেরায় ছবি তুলল। ডিজিটাল যুগে কেউ ছবি তুললেও ভয় করে। কে কোন কাজে লাগাবে কে জানে!   

লাঞ্চ শেষ করে আবার সৈকতে ফিরে গেলাম। তীর ধরে হাঁটছিলাম পূর্ব থেকে পশ্চিমে। গলের ওই এলাকায় একটি মন্দির রয়েছে। যাকে ইসালার মন্দির বলা হয়। সেখানে রুমাসাল পাহাড়ের প্রান্তে হনুমানের সম্মানে ঘর রয়েছে। ইসালা মন্দিরে প্রতি মাসে হাজার হাজার পূজারীর সমাগম ঘটে! বটে! ভারতীয় উপমহাদেশ আসলে পুরোটাই একটা বিশালাকৃতির উপাসনালয়। মানুষগুলোও ধর্মভীরু! নতুন ধান বা নতুন ফসলের একটা অংশ পূজারীরা নিয়ে যায় ওই মন্দিরে। দেবতা তুষ্টিতে। বৃষ্টিপাত এবং ফল ফসলের জন্য প্রার্থনা করেন তারা।

উনাবাতুনাকে ঘিরে একটা ট্যুরিস্ট সার্কেল তৈরি হয়েছে। জীববৈচিত্র্যকে প্রাধান্য দিয়ে ইকো ট্যুরিজম জোন গড়ে উঠেছে। ম্যানগ্রোভ এবং কডোলানা প্রজাতির গাছগাছালি রয়েছে এ অঞ্চলের বিশাল এলাকা জুড়ে। রয়েছে নানা প্রজাতির পাখপাখালি। বিশেষ করে এখানকার সাগর সোপানে রয়েছে প্রবাল প্রাচীর। পাথরের ধাক্কায় বিভিন্ন জাহাজ ভেঙে গেলে যুগ যুগ ধরে তার ভাঙা অংশ এখানে ডুবে আছে জলের নিচে। গল দূর্গের পূব দিকের এই এলাকায় জলের নিচের প্রবালগুলো স্কুবা ডাইভারদের আকর্ষণ করেন। প্রবালগুলো এখানে নাকি রীতিমত ঝোঁপঝাড়ের আকার ধারণ করেছে। জলের নিচে যারা ভ্রমণ করেন তাদের বলা হয় স্কুবা ডাইভার। টিভিতে স্কুবা ডাইভিং দেখতে ভীষণ ভালো লাগে। কিন্তু নিজে কখনো যাব, এটা সম্ভব না, জলের নিচে যেতে আমার ভীষণ ভয়। দম আটকে কখন কী হয়!  

উনাবাতুনা বিচের পশ্চিম প্রান্তে একটা চিকন জায়গা আছে। লম্বা একটা ভূখণ্ড সাগরের ভেতরে ঢুকে গেছে। আছে একটা সুন্দর মন্দির। কথিত আছে ওখানে একটা জার্মান চেইন হোটেল হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু দেবতারা সেখানে হোটেল করতে দেবে না এরকম একটা পণ করেছিলেন। সুনামি, ঝড় ইত্যাদি নানান কিছু দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে হোটেল তৈরিতে বাধা দিয়েছিলেন! কত কিছু যে রটায় মানুষ!

আমাদের দেশেও একটা জায়গা আছে এরকম। সেন্ট মার্টিন থেকে আরো দক্ষিণে বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপ- নাম তার ছেঁড়া দ্বীপ। ভাটার সময় এটা সেন্ট মার্টিনের সঙ্গে লেগে থাকে। জোয়ারের সময় পানি এসে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এজন্য এর নাম ছেঁড়া দ্বীপ। এই ছেঁড়া দ্বীপের আরো দক্ষিণে ছোট্ট এক টুকরো ভূখণ্ড রয়েছে। যার নাম যইগ্যার ঠোঁটা। মানে যইগ্যা নামে কারো ঠোঁট। এটি বাংলাদেশের শেষ ভূ-ভাগ। ওখানে নাকি পরীরা থাকে। আগে টেকনাফের শাহ পরীর দ্বীপে পরীরা থাকতেন। এখন সেখানে মানুষের আনাগোনা অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় পরীরা যইগ্যার ঠোঁটায় চলে গেছেন। ওখানে সাধারণত মানুষজন যান না খুব একটা। আমি যখন গিয়েছিলাম, তখনো ওখানে কেউ ছিল না। বালি আর পাথরের উপর ছোট ছোট হলুদ রঙা ফুল ফুটে ছিল। সেগুলো কি পরী ফুল!

উনাবাতুনার আরেকটা বৈশিষ্ট চোখে পড়লো। প্রতিটি হোটেল রেস্টুরেন্ট নিজেদের দায়িত্বে পরিবেশ সুন্দর রেখেছেন। নিজেরা পরিবেশবান্ধব গেট তৈরি করেছেন। সৌন্দর্যবর্ধক গাছ লাগিয়েছেন। শুনেছি, আগে এই সৈকতটিও নোংরা ছিল, অবৈধ স্থাপনা ছিল। সরকার সেগুলো উচ্ছেদ করেছে, পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা করেছে। আমাদের কক্সবাজার নিয়েও এরকম পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।

সৈকত থেকে উঠে উত্তরে হাঁটা শুরু করলাম। একটা লেবু গাছের কঁচি পাতা ছিঁড়ে নাকের কাছে ধরলাম। আহ! কি ঘ্রাণ! কি সুবাস! মনে পড়লো আনোয়ার উদ্দিন খানের একটা গান- কচি পাতার টিয়া রঙ..।

একটা অটো নিয়ে উনাবাতুনা থেকে যাচ্ছিলাম গলে, গল ফোর্টের দিকে।

** উনাবাতুনা- পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমুদ্র সৈকত

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ আগস্ট ২০১৯/উদয় হাকিম

     


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

ওয়ালটনে অগ্নিনির্বাপণ মহড়া

২০১৯-০৮-২৪ ৬:৪৯:১১ পিএম

লেজকাটা টিয়া

২০১৯-০৮-২৪ ৬:৪০:০০ পিএম

এবারও সবচেয়ে বেশি আয় স্কারলেটের

২০১৯-০৮-২৪ ৬:১৩:২১ পিএম

বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ইউটিউব মেসেজিং

২০১৯-০৮-২৪ ৫:১৩:১৭ পিএম