করোনাদুর্গত ফ্রান্স থেকে বলছি

প্রকাশ: ২০২০-০৪-২৫ ১২:২২:৩১ এএম
রবিশঙ্কর মৈত্রী | রাইজিংবিডি.কম

ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে প্যারিস এবং প্যারিসলগ্ন ছোটো ছোটো শহরে যখন রোজ করোনা রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছিল তখনও সবখানে স্বাভাবিক চলাচল ছিল। মাটির নিচে উপরে যেমন অবাধ চলাচল ছিল, তেমনি স্যেন নদীতেও প্রমোদ তরীর অভাব ছিল না। প্যারিস এবং মুলুজ শহরের হাসপাতালে রোজ রোজ করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ছিল অথচ ক্যাফে বার রেস্তোরাঁ সিনেমা থিয়েটার শপিং সেন্টারে ভিড় ছিল স্বাভাবিক। আর এই স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দেখে আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম।

১৭ই মার্চ ২০২০-এ পুরো ফ্রান্স একবারে লকডাউনে চলে যায়। সেদিন ফ্রান্সে করোনা রোগীর সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আমি অবশ্য প্যারিস থেকে আরো দু’সপ্তাহ আগে আলেসে ফিরে এসেছিলাম। প্যারিস থেকে আলেসের দূরত্ব যদিও প্রায় হাজার কিলোমিটার তবুও দ্রুতযান ট্রেনের ভ্রমণ সময় মাত্র তিন ঘণ্টা। আলেস প্যারিস আলেস যাওয়া-আসা তাই আমাদের কাছে খুবই সহজ এবং সম্পূর্ণ ঝামেলাহীন।

আলেস খুব একটা ছোটো শহর নয়। কিন্তু শহরের মূল কেন্দ্রে মাত্র পনেরো হাজার মানুষের বসবাস। আলেস এবং আলেসলগ্ন ছোটো ছোটো গ্রাম ও শহরগুলিতে মার্চ মাসেই বেশ ক’জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছিল। এ যাবত আমাদের নিকটবর্তী জনপদের ছত্রিশ জন করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন।

প্যারিস আর আলেসের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত, সবসময়। করোনাকালে প্যারিসের সকল কর্ম থেমে যায়নি, থামানো সম্ভব নয়। কিন্তু আলেসে এখন সম্পূর্ণই স্তব্ধ। এখানে এখন কূজন ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না।

প্যারিসে এখন গণপরিবহন সীমিত। কিছু মানুষকে জরুরি কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে। কিন্তু আলেসে কয়েকটি সুপার শপ আর একটি ডাকঘর ছাড়া সবকিছু বন্ধ। অথচ গত তিন সপ্তাহে আলেসে খুব সম্ভব আর একজনও করোনা রোগী পাওয়া যায়নি। কিন্তু তা বলে এখানে করোনার নিয়ম মেনে চলায় কোনও হেরফের হয়নি।

আমাদের পাশের জেলার নাম লোজার। করোনা মহমারিতে ফ্রান্সের একমাত্র ব্যতিক্রম লোজার জেলা, এখানে আজ অব্দি করোনায় কেউ মারা যাননি। মাত্র আঠারো জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছিল প্রকৃতির অশেষ আশীর্বাদধন্য লোজারে। আঠারো জনের বারো জনই এরই মধ্যে সেরে উঠেছেন এবং বাকি ছয় জন চিকিৎসাধীন আছেন।

আলেস মূলত সেভেন পাহাড়ের প্রবেশদ্বার শহর। আলেস থেকে উত্তর-পুবে এবং উত্তর-পশ্চিমে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে ছোটো ছোটো গ্রাম এবং মাঝে মাঝে ঝরনা-নদীতীরে ছোটো ছোটো খামার। আমরা ফ্রান্সের এমন একটি অঞ্চলে আছি যে অঞ্চলকে বলা হয়- ফ্রান্সের ভূস্বর্গ। আল্পস সেভেন আর পিরহেন পাহাড় এবং ভূমধ্যসাগরতীরবর্তী এই অক্সিতানি রাজ্যে সম্পদের অভাব নেই। সম্ভবত ইউরোপের সবচেয়ে বেশি আঙুর হয় এই অঞ্চলে। চিজ দুধ এবং ওয়াইনখ্যাত অক্সিতানি রাজ্যে মানুষের বসবাসস্থানগুলো বেশ দূরে দূরে।

অক্সিতানি রাজ্যের আয়তন বাংলাদেশের অর্ধেক কিন্তু লোকসংখ্যা মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ। এখানকার গ্রামাঞ্চলে করোনা রোগী প্রায় শূন্য। এই রাজ্যের রাজধানী মোঁপেলিয়ে-সহ কয়েকটি বড়ো শহরের কিছু মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

ফ্রান্সে এখন প্রতিদিন নতুন করোনা রোগীর সংখ্যা কমে আসছে, কমছে মৃত্যুর হার। ১১ই মে পর্যন্ত ফ্রান্সে লকডাউন চলবে। কিন্তু ১১ই মের পরে ক্যাফে বার রেস্তোরাঁ থিয়েটার সিনেমা লাইব্রেরি খোলা হবে না। এখানে কারও চোখে-মুখে করোনা নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নেই, অথচ এ দেশে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা একলাখ ষাট হাজার ছাড়িয়ে গেছে, মৃত্যুর সংখ্যাও বাইশ হাজারের কাছাকাছি। একই ভবনের পাশের অ্যাপার্টমেন্টে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং তিনি বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন— তাতে প্রতিবেশীদের আপত্তি ও দুশ্চিন্তা নেই। কারণ, আমরা করোনা থেকে বাঁচার জন্য নিয়মগুলো কঠোরভাবে মেনে চলছি।

ফ্রান্সের যে-সব এলাকায় গত চৌদ্দ দিনে একজনও করোনা রোগী পাওয়া যায়নি সে-সব এলাকার কেউ ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সমগ্র ফ্রান্সের লকডাউনের নিয়ম ভাঙছেন না। আমি বরাবর আশাবাদী মানুষ। করোনার প্রাদুর্ভাব তিন-চার মাসের মধ্যে লঘু হয়ে যাবে। কোভিড-১৯ সম্পূর্ণ নির্মূল হতে হয়তো আরও সময় লাগবে কিন্তু সে জন্যে ধৈর্য হারালে চলবে না।

ফ্রান্স আধুনিক কৃষিতে খুবই উন্নত, কিন্তু কৃষিনির্ভর দেশ নয়। কিন্তু করোনাকালে ফ্রান্স সরকার এবং খামার মালিকরা এবার কৃষিতে গুরুত্ব দিয়েছেন। কৃষি খামারগুলোতে এখন কর্মীর অভাব হয়েছে বলে দুই লক্ষাধিক ফরাসি তরুণ-তরুণী স্বেচ্ছাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, তাঁরা মূলত ছাত্রছাত্রী এবং অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত আছেন; লকডাউনের ছুটিকালীন তাঁরা কৃষি খামারগুলোতে জাতীয় স্বার্থে কাজ করে দিচ্ছেন।

করোনা মহামারি থেকে আমরা শুধু মৃত্যুভয় পাব না, নিশ্চয়ই এই সময়ে নিজেকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারব। আমরা আসলে কী চাই? আমরা চাই, শান্তি স্বস্তিময় সার্থক শুদ্ধ সুন্দর জীবন। আর এই জীবনের জন্য খুব বেশি অর্থ মান যশ এবং খুব জ্ঞানী হবার দরকার হয় না। অচেনা স্বপ্নের পেছনে ছুটে ছুটে ক্লান্তি এবং বিষাদ না বাড়িয়ে প্রভাবিত অনন্ত চাহিদাকে টেনে ধরে নিজেকে একটু সহজ সুন্দর মানুষ করে তোলার এই তো সময়। হ্যাঁ, এভাবেই ভাবতে শেখাচ্ছেন আমাকে আমার ফরাসি বন্ধু বন্ধুনীরা।

লেখক: প্রাবন্ধিক, আবৃত্তিকার


ঢাকা/তারা


     



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

আজ গাইবেন ড. মাহফুজুর রহমান

২০২০-০৫-২৬ ৭:১৬:৪২ পিএম

ভয়াবহ ঈদ পালন কর‌তে হ‌চ্ছে: আসিফ

২০২০-০৫-২৬ ৬:২৫:৩৮ পিএম