করোনা তুমি যাও, ভয়টাকে রেখে যাও

প্রকাশ: ২০২০-০৪-২৭ ২:০৯:২২ এএম
এম এ কবীর | রাইজিংবিডি.কম

ছেলেবেলায় দু’টি মহামারি দেখেছি। কলেরা এবং গুটি বসন্ত। নাম মুখে আনা বারণ ছিল। ‘অসুখ’, ‘বলা’ ডাকা হতো। মনে পড়ে, মায়ের বুকে লুকিয়ে থাকতাম। মশারি ফেলে রাখা হতো চব্বিশ ঘণ্টা।

নিরাময়ের কিছু ব্যবস্থার কথাও মনে আছে। হুজুরের পড়া পানির ঝিটকা দেওয়া হতো শরীর আর ঘরে-বাইরে। আমাদের ঘরের মূল ফটকে বেড়ার সঙ্গে নিম গাছের ডাল লাগিয়ে রাখা হতো। উদ্দেশ্য ছিল ‘বলা’, ‘মুসিবত’, ‘আলগা’ বাতাস যেন ঘরে প্রবেশ করতে না পারে। মা প্রতিদিন সাদা বেলে মাটি দিয়ে ভিটার ডেলা লেপে দিতেন। একটা নান্দনিক শিল্পের ছাপও থাকত। দীর্ঘদিনের পরিচিত নারী ভিক্ষুকদের এ সময় ভিক্ষা দেওয়া হতো না।

গ্রামের হেকিম সাহেবের লাল মিকচারের দাওয়াই দেয়া হতো। আজও মনে পড়ে, মা দৌড়ে গিয়ে জ্বর সারানোর জন্যে গায়ে সরু সাদা কাগজের থরে থরে দাগ কাটা ছোট বোতলের মিকচার আর কতক পুরিয়া পাউডার নিয়ে আসতেন। ‘আল্লাহ শাফি’ করে মা খাওয়াতেন। মশারির ভেতরে থেকেই পথ্য আর খাওয়া-দাওয়া চলতো। মা-ই লোকমা ধরে ধরে খাওয়াতেন। করলা ভাজি ছিল গরম ভাতের সাথে প্রধান তরকারি। আহা! মায়ের হাতে কত থাপ্পড়ই না খেয়েছি ওই তিতা করলা না খাবার জন্যে। বলা হতো, কালিজিরা ভর্তা না খেলে ‘বলা’ যাবে না। এই করোনা সংকটে বারবার কথাগুলো মনে পড়ে। মুড়ি আর চিড়া খেতাম সুস্বাদু নারকেলের সাথে। মধু ছিল আরেক প্রয়োজনীয় উপকরণ।

আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমাদের চার গ্রামের অতন্দ্র প্রহরি ময়রার বাপের কথা। ছোটখাটো পঞ্চাশ-ঊর্ধ্ব এই কাকা আমাদের রমজানের সেহরির সময় টিনের চুঙ্গা ফুকে এ-পাড়া থেকে ও-পাড়ায় গিয়ে সবাইকে ঘুম থেকে উঠাতেন। একইভাবে ওই দুটো মহামারির সময় ময়রার বাপের ভ‚মিকা খুব মনে পড়ে। এই দুর্যোগের রাতে তিনি বাড়ি থেকে বাড়ির সদর ফটকে গিয়ে সবাইকে মহামারি থেকে সাবধানে থাকার কথা বলতেন। গভীর রাতে এ-পাড়া ও-পাড়ায় আজান দিতেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার কথা বলতেন; ধর্ম-কর্ম পালন করার কথা বলতেন। যে যা পারে তার থেকে টাকা উঠাতেন। একটা ‘ফান্ড’ তৈরি করতেন গরিব হতভাগ্যদের জন্যে যাদের পরিবারের দাফন করার সামর্থ্য ছিলো না।

কল্পনায় এখনো দেখতে পাই, মশারির নিচে মমতাময়ীর হাতের পরশ নিচ্ছি আর ইথারে ময়রার বাপের চুঙ্গা ফুকানোর বাণী শুনছি: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ইল্লাল্লাতে নূর, পাক মুখে বলি আল্লাহ্ ’বলা’ কর দূর’। ভাবছি, বহু মহামারি সংকট আমরা অতিক্রম করেছি। এখনও করব ইনশাল্লাহ। ভাবতে ভাবতে কেন জানি চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন টুডো এ সংকটে দেশবাসীর সামনে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আপনাদের জন্য আজ আমি প্রধানমন্ত্রী, জনগণের সেবা ও নিরাপত্তা দেওয়া আমার প্রধান কাজ। আমি চাইলে নিজে ঘরে বন্দি থাকতে পারতাম। তবু সাহস নিয়ে আপনাদের খোঁজ-খবর নিচ্ছি, বের হচ্ছি। কারণ আপনারাই আমার অক্সিজেন। আপনারা সুস্থ থাকলেই আমি সুস্থ। আপনাদের থেকে গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে কিছুই নেই।’ প্রিয় জাস্টিন টুডো! স্যালুট আপনাকে। আপনার কথা আগামীর বিশ্ব স্মরণে রাখবে। সাধারণ মানুষ স্বস্তি চায়। একটু আশ্বাস চায়। দেখতে চায় এই দুঃসময়ে রাষ্ট্রের আন্তরিকতা।

৬৩৮ সালে প্লেগে আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম সেরা শাসক হজরত ওমর (রা.)। তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন প্লেগে আক্রান্ত তার শাসনাধীন প্রতিটি অঞ্চলে। ৬৩৯ সালে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে জীবন দিয়েছিলেন সিরিয়ার গভর্নর আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ। রোগে আক্রান্ত মানুষকে নিয়ে কাজ করার সময় তাঁকে মদিনায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন ওমর। তিনি যাননি। বলেছিলেন, আমার সৈন্য ও সাধারণ মানুষকে রেখে মদিনায় নিরাপদে যেতে পারি না। আমি তাদের সঙ্গে থেকেই কাজ করে যাব।

এই করোনার দুর্যোগে অনেক কথা, অনেকের কথা, অতীত ইতিহাসের কথা মনে পড়ছে। এ রকম কত দিন চলবে কেউ জানি না। আশাবাদীরা বলছেন তিন-চার মাস। আবার এমনও পড়েছি, অন্তত দেড় বছর! ভাইরাস বাঘ-সিংহের নীতিতে শিকার ধরে। সবাইকে সমানভাবে বেকায়দা করতে পারে না। যাদের শরীরে ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতা কম, তাদেরই ভালো করে কব্জা করে। ফলে সাবধান না হয়ে উপায় নেই। কিছু মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন- এতো কড়াকড়ি কেন? জনসংখ্যা এবং সংক্রমণের অনুপাতের হিসাব দেখিয়ে অনেকেই বলছেন, এখনই এমন বাড়াবাড়ির প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু এখন তর্কের সময় নয়। অন্তত কয়েক সপ্তাহ তো নয়ই। এখন প্রয়োজন শতকরা একশ ভাগ সতর্ক থাকা। এককথায় বলা যায় যুদ্ধকালীন সতর্কতা। প্রশ্ন আবার কিছু পÐিত করতেই পারেন, এর ফলে মানুষ অনর্থক আতঙ্কিত হয়ে পড়বে না তো? তার উত্তর হলো, আতঙ্ক দূরে রাখার জন্যই চূড়ান্ত সতর্কতার প্রয়োজন। যাতে বাধ্য হয়ে জনজীবন অচল করতে না হয়, সেই কারণেই জনসমাগম ও  সামাজিক মেলামেশা যথাসম্ভব কমানো জরুরি। কারণ এ ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে এছাড়া উপায়ও নেই। যেহেতু প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

বিশ্ববাসীকে এমনিতেই নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হয়। গত ডিসেম্বরে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুর দিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পঙ্গপালের আক্রমণের বিষয়টিও সামনে আছে। পঙ্গপালের আক্রমণে প্রায় ২০ শতাংশ ফসলের হানি ঘটবে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, সময়সাপেক্ষ হলেও করোনা পরিস্থিতি হয়তো মোকাবিলা করা যাবে; কিন্তু এই ‘বাধ্যতামূলক পরিস্থিতি’ শেষে যে গভীর সংকট বিশ্ববাসীকে মোকাবিলা করতে হবে, তা হলো খাদ্য সংকট। বিভিন্ন গবেষণা থেকে উঠে আসা আগাম এই আশঙ্কার বার্তা সার্বিক বিবেচনায় উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যে কারণে এই মহামারি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে বিশ্ববাসীকে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। উন্নত দেশগুলোর বিজ্ঞানীদের সমবেত প্রচেষ্টায় দ্রæততার সঙ্গে ভাইরাস প্রতিরোধী টিকা আবিষ্কৃত হতে পারে। বিশ্ববাসীর মনে রাখতে হবে, এটা মানবতার বিপর্যয়। একক কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর জন্য এ বিপর্যয় নির্ধারিত নয়। মানব জাতিকে রক্ষা করতে হলে ভাইরাস সংক্রমণ এবং মৃত্যু যেমন ঠেকানো প্রয়োজন, তেমনি অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্যও যথাযথ পরিকল্পনা জরুরি। ভবিষ্যতে অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বকে কোন দেশ শাসন করবে, এমন গুঞ্জন ইতিমধ্যে উঠেছে। আমি মনে করি, এই বিপর্যয়সংকুল পরিস্থিতিতে সেটা বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। বরং সামগ্রিকভাবে এ দুর্যোগ মোকাবিলা করা জরুরি। বিশ্ববাসীর প্রাণরক্ষা এবং ভবিষ্যতে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা থেকে মুক্তি দিতে পারে উন্নত দেশগুলোই। বিশ্ব নেতৃত্ব কি এগিয়ে আসবে না ভয়াবহ এই মহামারী-বিপর্যয় থেকে মানুষকে উদ্ধার করতে?

লেখক: সাংবাদিক


ঢাকা/তারা


     



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

ভয়াবহ ঈদ পালন কর‌তে হ‌চ্ছে: আসিফ

২০২০-০৫-২৬ ৬:২৫:৩৮ পিএম

মাধবপুরে জমি নিয়ে সংঘর্ষে নিহত ১

২০২০-০৫-২৬ ৫:৫৮:৫৩ পিএম

করোনায় আক্রান্ত ৫৬ লাখ ছাড়িয়ে

২০২০-০৫-২৬ ৫:৪২:৩২ পিএম

শামীম জামানের ‘বাবার উপহার’

২০২০-০৫-২৬ ৫:৩৬:৩৬ পিএম